স্বাধীনতার শিখরে যে বাংলাদেশ তার শিকড় ৬ দফা

‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা উইথড্র হলো, আমরা খালাস পেলাম। কিন্তু আবার একটা ফন্দি করা হলো। রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স। উদ্দেশ্য ছিলো একটা কনস্টিটিউশন প্রবলেম সলভ করা। আমি আমার সহকর্মী ছাড়াও কয়েকজন বিশেষজ্ঞকে নিয়ে গেলাম সাথে। কারণ, আমাদের বুঝতে হবে, এটা রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স না ধোঁকা।’ উপর্যুক্ত কথাগুলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের।

রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সের নামে এটা ছিলো পদচ্যুত হওয়ার আগমুহূর্তকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের এক চরম ধোঁকাবাজি। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় ‘আসলে এটা ছিল বাংলার শোষণ করার আরেকটা ষড়যন্ত্র। আমি তা রিজেক্ট করলাম। বলে দিলাম, সংগ্রাম করে বাংলার মানুষ তাদের দাবি আদায় করবে, রাউন্ড টেবিলে বসে নয়।’

‘কেন ৬ দফা এবং কি ছিলো তাতে’

১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান-ভারত ১৭ দিনের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে সম্পাদিত হয়  ‘তাসখন্দ চুক্তি’। ১৯৬৬ সালের ১৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক শেষে প্রাদেশিক সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, আমরা তাসখন্দ ঘোষণা নিয়ে চিন্তিত নই। আমরা আমাদের কথা ভাবছি। আমরা চাই ‘পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন।

যুদ্ধোত্তর পাকিস্তান জটিল এক পরিস্থিতি বিরাজ করছিলো। নেজামে ইসলাম প্রধান চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর লাহোরের বাসভবনে নিখিল পাকিস্তান বিরোধী দলীয় এক বৈঠক আহবান করা হয়। মুসলিম লীগ (কাউন্সিল) সভাপতি সৈয়দ আফজালের সভাপতিত্বে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। ওই বৈঠকেই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ৬ দফা প্রস্তাব পেশ করেন।

শেখ মুজিব ৬ দফা প্রস্তাব পেশের প্রারম্ভে বলেন, ভারতের সাথে বিগত সতের দিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ রেখে জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো সম্পর্কে আজ নতুনভাবে চিন্তা করে দেখা অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে শাসনকার্য নির্বাহের ক্ষেত্রে বাস্তব যেসব অসুবিধা দেখা দিয়েছিল তার পরিপ্রেক্ষিতেই এই প্রশ্নটির গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কথা আজ আর অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জাতীয় সংহতি অটুট রাখার ব্যাপারে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রগাঢ় আন্তরিকতা ও দৃঢ় সংকল্পই দেশকে এই অস্বাভাবিক জরুরি অবস্থাতেও চরম বিশৃঙ্খলার হাত হতে রক্ষা করেছে। এই অবস্থার আলোকে সমগ্র পরিস্থিতি বিবেচনা করে পাকিস্তানের দুটি অংশ যাতে ভবিষ্যতে আরো সুসংহত একক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে পরিগণিত হতে পারে এই সংক্ষিপ্ত ইশতেহারটির (৬ দফা) লক্ষ্য তা-ই।

“শেখ মুজিবুর রহমানের পেশকৃত ৬ দফা”

প্রস্তাব দফা –১, শাসনতান্ত্রিক কাঠামো রাষ্ট্রীয় প্রকৃতিঃ

দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো এমনি হতে হবে যেখানে পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেশনভিত্তিক রাষ্ট্রসংঘ এবং তার ভিত্তি হবে লাহোর প্রস্তাব। সরকার হবে পার্লামেন্টারী ধরনের। আইন পরিষদ (Legislatures) ক্ষমতা হবে সার্বভৌম এবং এই পরিষদও নির্বাচিত হবে সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনসাধারণের সরাসরি ভোটে।

দফা-২. কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতাঃ

কেন্দ্রীয় (ফেডারেল) সরকারের ক্ষমতা কেবলমাত্র দুটি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে – যথা, দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি। অবশিষ্ট সকল বিষয়ে অঙ্গ রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতা থাকবে নিরঙ্কুশ।

দফা-৩, মুদ্রা বা অর্থসম্বন্ধীয় ক্ষমতাঃ

মুদ্রার ব্যাপারে নিম্নলিখিত দুটির যেকোনো একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা যেতে পারে।

(ক) সমগ্র দেশের জন্য দুটি পৃথক, অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা চালু থাকবে।

অথবা

(খ) বর্তমান নিয়মে সমগ্র দেশের জন্য কেবলমাত্র একটি মুদ্রাই চালু থাকতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে শাসনতন্ত্রে এমন ফলপ্রসূ ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে করে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচারের পথ বন্ধ হয়। এক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক ব্যাংকিং রিজার্ভেরও পত্তন করতে হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক আর্থিক বা অর্থনৈতিক নীতি প্রবর্তন করতে হবে।

দফা- রাজস্ব, কর বা শুল্ক সম্বন্ধীয় ক্ষমতাঃ

ফেডারেশনের অঙ্গ রাষ্ট্রগুলোর কর বা শুল্ক ধার্যের ব্যাপারে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনরূপ কর ধার্যের ক্ষমতা থাকবে না। তবে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য অঙ্গ – রাষ্ট্রীয় রাজস্বের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাপ্য হবে। অঙ্গ – রাষ্ট্রগুলোর সবরকমের করের শতকরা একই হারে আদায়কৃত অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল গঠিত হবে।

দফা- বৈদেশিক বানিজ্য বিষয়ক ক্ষমতাঃ

(ক) ফেডারেশনভুক্ত প্রতিটি রাষ্ট্রের বহির্বাণিজ্যের পৃথক হিসাব রক্ষা করতে হবে। (খ) বহির্বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অঙ্গ রাষ্ট্রগুলোর এখতিয়ারাধীন থাকবে। (গ) কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা সমান হারে অথবা সর্বসম্মত কোন হারে অঙ্গ রাষ্ট্রগুলোই মিটাবে। (ঘ) অঙ্গ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দেশজ দ্রবাদি চলাচলের ক্ষেত্রে শুল্ক বলা কর জাতীয় কোন বাধা নিষেধ থাকবে না। (ঙ) শাসনতন্ত্রে অঙ্গ- রাষ্ট্রগুলোকে বিদেশে নিজ নিজ বানিজ্যিক প্রতিনিধি প্রেরণ এবং স্ব স্বার্থে বানিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দিতে হবে।

দফা- ৬ আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতাঃ

আঞ্চলিক সংহতি ও শাসনতন্ত্র রক্ষার জন্য শাসনতন্ত্রে অঙ্গ- রাষ্ট্রগুলোকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধা সামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও রাখার ক্ষমতা দিতে হবে।

বৈঠকেই প্রতিক্রিয়া”

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা দাবি প্রস্তাব আকারে পেশ করার সঙ্গে সঙ্গে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় বিরোধী দলীয় ওই বৈঠকে।

পাকিস্তানের এককালীন প্রধানমন্ত্রী ও নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি চৌধুরী মোহাম্মদ আলী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপন যুক্তিযুক্ত না। আলোচ্য বিষয় হোক আইয়ুব খান ও কাশ্মীর সমস্যা, যে সমস্যা তাসখন্দ চুক্তি নির্ভর।

শেখ মুজিব জবাবে যুদ্ধকালীন পূর্বপাকিস্তানের অসহায়ত্বের চিত্র তুলে ধরে ৬ দফার যৌক্তিকতা ব্যাখা করলেন। কিন্তু কোনক্রমেই ৬ দফা বৈঠকের আলোচ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হলো না।

শেখ মুজিব শেষমেশ বৈঠক ত্যাগ করেন। পরের দিন পশ্চিম পাকিস্তানের সংবাদপত্র ৬ দফার বিকৃতি করে প্রকাশ করে। ঢাকার সংবাদপত্রেও ৬ দফার সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রকাশ হয়। আওয়ামী লীগের কতিপয় প্রবীণ নেতা মধ্যে সমালোচনা শুরু হয়। ১১ ফেব্রুয়ারি বিক্ষুব্ধ শেখ মুজিব ঢাকায় ফিরে দেখেন পোস্টারে পোস্টার ঢাকার দেয়াল ছেয়ে গেছে। যাতে লেখা “বাঙালির দাবি ৬ – দফা, বাঁচার দাবি ৬ দফা, ৬ -দফার ভেতরে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন নিহিত” ইত্যাদি।

শেখ মুজিব সাংবাদিক সম্মেলন করলেন ওদিনই। ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার দৈনিকগুলোর মধ্যে ইত্তেফাক, সংবাদ ও মর্নিং নিউজ গুরুত্বসহকারে  সংবাদ পরিবেশন করে। ১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ দিবসে  ৬ দফা সম্বলিত একটি পুস্তিকা বিলি করা হয়। পুস্তিকাটির গায়ে লেখা ছিল আওয়ামী লীগ কার্যালয় ৫১ পুরাণা পল্টন থেকে প্রকাশিত ও প্রচার সম্পাদক আব্দুল মোমিন কর্তৃক প্রচারিত এবং গ্লোব প্রিন্টার্স থেকে মুদ্রিত। ২৬ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের সাবজেক্ট কমিটির বৈঠকে তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে রাজশাহীর মজিবর রহমানের সঙ্গে ৬ দফা নিয়ে প্রচন্ড বাকবিতন্ডা হয়। বেশির ভাগ প্রবীণ নেতাই ৬ দফার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এএইচএম কামরুজ্জামান, তাজউদ্দীন আহমদ, আব্দুল মান্নান, আব্দুল মোমিন, বাহাউদ্দীন চৌধুরী, মোল্লা জালাল উদ্দীন প্রমুখ পক্ষ অবলম্বন করেন।

১২ মার্চ ১৯৬৬ ঢাকায় গমন করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফ্লিড মার্শাল আইয়ুব খান। রমনার গ্রীনে বেসিক ডেমোক্রেসির মেম্বারদের সম্মেলন উদ্বোধন করে আইয়ুব খান বলেন, ‘আজ যারা স্বায়ত্তশাসনের ফরমুলা দিচ্ছে, তারা বস্তুত জনগণের মুক্তি চায় না। ৬ দফা প্রণয়নকারী দল আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের শত্রু।’

পূর্ব পাকিস্তান মুখ্যমন্ত্রী মোনেম খান চরম হুমকি প্রদর্শন করে বলেন, ৬- দফা আন্দোলনকারীদের কঠোর হস্তে দমন করা হবে।  আইয়ুব খানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো শেখ মুজিবকে ৬ দফা নিয়ে এই বলে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন যে প্রকাশ্য বিতর্কে তিনি প্রমাণ করবেন ৬-দফা পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার কর্মসূচি। শেখ মুজিব সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেও মুজিব-ভুট্টোর মধ্যে সেই বিতর্ক হয়ে ওঠেনি। ১৭ মার্চ আইয়ুব খান ময়মনসিংহ সফরে এসে বলেন, পাকিস্তানের সংহতি বিনষ্ট করার জন্য একদল বিচ্ছিন্নতাবাদী ৬ দফার নামে দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ওরা চায় যুক্ত বাংলা।

পরের দিনই বৈঠক বসলো আওয়ামী লীগের। সভাপতি মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশসহ কয়েকজনের প্রবল বাধা সত্ত্বেও সংখ্যাগরিষ্ঠ্যতার জোরে ৬ – দফা ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে পাস হয়ে যায়। দিকবিদিকশুন্য হয়ে সভাপতি মওলানা তর্কবাগীশ তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে বৈঠক ত্যাগ করেন। ফলে ওই বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হয় যে ১৮ ও ১৯ মার্চ দলীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। যথারীতি ইডেন হোটেলে তর্কবাগীশ অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হয়। এই কাউন্সিলেই সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা দেন যে, সরাসরি রাজপথে যদি আমাকে একা চলতে হয়, চলবো। কেননা ইতিহাস প্রমাণ করবে বাঙালির মুক্তির জন্য এটাই সঠিক পথ। কাউন্সিলরা সর্বসম্মতিক্রমে শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি নির্বাচিত করে ৬ দফার অনুমোদন ঘোষণা করে। দৈনিক ইত্তেফাকে সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ৬ দফার পক্ষে আবিস্কার করেন “মুসাফির” কলাম।

২০ মার্চ পল্টন ময়দান থেকে শুরু হয় সারাদেশে জনসভা। ১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ থেকে ৮ মে পর্যন্ত সময় পেয়েছিলেন শেখ মুজিব। মানে ৩৫ দিন।

“আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা”

৬ দফার আন্দোলন ক্রমেই সরগরম হয়ে উঠছিলো। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান যতোই হুমকি দেন, বাংলার গ্রামগঞ্জ ততোই ফুঁসে ওঠে। ১৩ হাজার নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়ে গেছে এরই মধ্যে। আর শেখ মুজিবের বেলায় ঘটলো একের পর এক গ্রেফতার আর মুক্তির ঘটনা।

১৯৬৮ সালের ৬ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার এক সরকারি প্রেসনোটে ঘোষণা করলো যে, ১৮ জন সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তি ভারতীয় হাইকমিশনের সাথে ষড়যন্ত্র করে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। যথাসময়ে সরকার ষড়যন্ত্রকারীদের ধরে ফেলেছেন। ১৮ জন বাঙালি অফিসারকে এই অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে আসামির সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। ১৮ জানুয়ারি সরকারের আরেকটি প্রেসনোটে জানানো হলো, পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের মূল নায়ক শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁকেও ঢাকা সেন্ট্রাল জেল গেট থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ১৭ জানুয়ারি গভীর রাতে শেখ মুজিবকে জানানো হয় যে তাঁকে মুক্তি দেয়া হয়েছে এবং এক্ষুণি তাঁকে জেল ত্যাগ করতে হবে। বের হবার সঙ্গে সঙ্গে আর্মিরা শেখ মুজিবকে জিপে তুলে ঢাকা কুর্মিটোলা সেনানিবাসে নিয়ে যায়। ১৯৬৯ সালের ১৪ জানুয়ারিতে গঠিত হয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে। ১১ দফা ভিত্তিক সেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলনের প্রধান নেতা ছিলেন ছাত্র সংগঠনগুলোর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের আব্দুর রউফ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, ছাত্র ইউনিয়নের সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, শামসুদ্দোহা, ছাত্রইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) মাহবুব উল্লাহ, দীপা দত্ত,  এন এসএফ এর মাহবুবুল হক দোলন, ইব্রাহিম খলিল ও ডাকসু জিএস নাজিম কামরান। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফার মধ্যে ৬ দফা অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৬৯ সালের ১৪ জানুয়ারি ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় সমাবেশ থেকে। ২০ জানুয়ারি ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে নিহত হন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা এ এম আসাদুজ্জামান। ২৪ জানুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে হরতাল। ওদিন মিছিলে গুলি চালালে নবকুমার ইনস্টিটিউটের ছাত্র মতিউর নিহত হন।  এ ছাড়াও নিহত হন মকবুল রুস্তম আলমসহ আরও অনেকে। ওদিন দৈনিক পাকিস্তান ও মর্নিং নিউজ ভবন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এরপর ২৮,২৯,৩০, ৩১ জানুয়ারি ইপিআর ও সেনাবাহিনীর গুলিতে একের পর এক কেবল নিহত হবার খবর। এমন পরিস্থিতিতে ৫ ফেব্রুয়ারি  আইয়ুব খান বলেন, আগামি ১৭ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দলের সাথে আমি মতবিনিময় করতে চাই। কিন্তু ১৫ ফেব্রুয়ারি ক্যান্টনমেন্টে সার্জেন্ট জহুরুল হক ও সার্জেন্ট ফজলুল হকের ওপর গুলি চালানো হয়।

সার্জেন্ট জহুরুল হক নিহত হন। পল্টনে জহুরুল হকের জানাজা শেষে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে একটি জঙ্গি মিছিল “জ্বালাও – পোড়াও” ধ্বনি দিয়ে রাজপথ উত্তপ্ত করে তোলে। মুসলিম লীগ অফিস,  নবাব হাসান আসকারী, খাজা শাহাবুদ্দিন, মংসু প্রু ও সুলতান আহমেদ প্রমুখ মন্ত্রীর বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনী হত্যা করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডঃ শামসুজ্জোহাকে। এ খবর এলে ঢাকায় আগুন ছড়িয়ে দেয়া হয় সরকারি বহু ভবনে। ঢাকা সেনা নিবাসের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচারক তাঁর বাসভবন থেকে পালিয়ে যান। আন্দোলন পরিণতি লাভ করে গণঅভ্যুত্থানে। ২১ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে বলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা খারিজ করা হয়েছে। আমি আর নির্বাচনে দাঁড়াবো না। ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্তরা ক্যান্টনমেন্ট থেকে মুক্তিলাভ করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে ছাত্রজনতার পক্ষে ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করেন।

“৬ দফা থেকে বাংলাদেশ”

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুখেই শোনা যাক কথাটি। ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু বলেন,”…. পনেরশ’ মাইল দূরের দুটি অংশ নিয়ে কোন সময় কোন একটি রাষ্ট্র হয়েছে বলে আমার জানা নাই। কিন্তু আমরা ধর্মভীরু মানুষ তাই পাকিস্তানীরা ধর্মের নামে এক রাষ্ট্রের দোহাই দিতে আরম্ভ করলো। আমরা যারা ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করছিলাম তারা সংগ্রাম করেছি। যারা বুঝতে চেষ্টা করে নাই তারা তাদের দালালি করেছে। আমরা চিন্তা করে দেখলাম এদের সাথে আমাদের চলবে না। যেখানে আদর্শের মিল নাই, যেখানে মতের মিল নাই, যেখানে ভাষার মিল নাই, যেখানে চিন্তার মিল নাই, সেখানে এক রাষ্ট্র চলতে পারে না। পনেরশ’ মাইলের ব্যবধানে তার সাথে আমাদের কোন প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নাই। এক রাষ্ট্র করা হয়েছিল বাংলাদেশকে শোষণ করার জন্য। কলোনি করার জন্য।

১৯৬৪ সালের আমার নেতা সোহরাওয়ার্দী সাহেব ইন্তেকাল করলেন। আওয়ামী লীগকে এরপর রিভাইব করলাম। অনেক ভাঙ্গা গড়া হলো। ১৯৬৬ সালে দিলাম ৬ -দফা। গণঅভ্যুত্থান হলো। আইয়ুব খান বিদায় নিলেন। বসিয়ে দেয়া হলো ইয়াহিয়া খানকে। তিনি নির্বাচন দিলেন আমরা ৬ দফার পক্ষে ম্যান্ডেট পেলাম। জাতীয় পরিষদে ১৬৯টি আসনের ১৬৭টিই পেলাম। ইয়াহিয়া খান আঁতকে উঠলেন। তার পরের ইতিহাস চরম ইতিহাস। আমি বলেছিলাম ৬ দফা জনগণের সম্পদ, আওয়ামী লীগের আর শেখ মুজিবুর রহমানের সম্পদ নয়। এটির সঙ্গে আপোষ চলে না। বঙ্গবন্ধু কথা রেখেছিলেন তিনি আপোষ করেননি। ফলে সাড়ে কোটি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতার  দৈহিক অনুপস্থিতি থাকলেও তাঁর নির্দেশিত পথে পরিচালিত হয়েছে মুজিব নগর সরকারের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অভ্যুদয় ঘটেছে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী  বাংলাদেশের। ৭ জুন ছয় দিবস এক ঐতিহাসিক দিন- প্রকারান্তরে এটি জাতীয়ভাবে হওয়া উচিত “মুক্তি দিবস” কেননা এই মুক্তির সংগ্রামের পরিণতি মুক্তিযুদ্ধ। অবশ্যই স্বাধীনতার শিখরে যে বাংলাদেশ তার শিকড় ৬ দফায়।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।