চৌগাছায় করোনায় মৃত ভাইয়ের খাটিয়াও ধরলো না ভাই

চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি: যশোরের চৌগাছায় এবার করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া ওলিয়ার রহমান (৩৮) নামে এক সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তার লাশ গোসলের পর মোছার জন্য একটি গামছাও না দেয়ার অভিযোগ উঠেছে পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে। পরে লাশ গোসল দানকারীরা এক প্রকার জোর করেই পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে একটি গামছা নিয়ে তার লাশের পানি মুছান। এরপর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করেন। দাফনের সময় গ্রামের বাড়িতে থাকা তার সহোদর গ্রাম ডাক্তার আবু জাফর কবরস্থানে গেলেও ভাইয়ের লাশ বহন করা খাটিয়াটিও ধরেন নি।

আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১০ টার দিকে খড়িঞ্চা গ্রামে মরহুমের নিজ বাবার বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে।

ওলিয়ার যশোরের চৌগাছা উপজেলার স্বরুপদাহ ইউনিয়নের খড়িঞ্চা গ্রামের আবু তৈয়ব ওরফে চকম আলীর ছেলে। তিনি যশোর শহরে স্ত্রী-কন্যা নিয়ে নিজের বাড়িতে থাকতেন।

লাশ দাফন করতে যাওয়া চৌগাছার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘অগ্রযাত্রা’ টিমের সদস্য এবং প্রতিবেশিরা জানান, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে খুলনার একটি হাসপাতালে আইসিইউ থাকা অবস্থায় মঙ্গলবার ভোর ৪টার দিকে মারা যান ওলিয়ার রহমান (৩৮)। তিনি সোনালী ব্যাংকের যশোর শিক্ষাবোর্ড শাখার সিনিয়র কর্মকর্তা ছিলেন। আবু তৈয়বের পাঁচ ছেলের মধ্যে ওলিয়ার ছিলো চতুর্থ। ওলিয়ারের বড় ভাই আব্দুর রাজ্জাক কয়েকমাস আগে মারা যান। সেজো ভাই প্রবাসী আর ছোট ভাই ঢাকায় একটি ব্যাংকে চাকরি করেন। আর মেজো ভাই খড়িঞ্চা বাজারের গ্রাম ডাক্তার। এলাকায় তিনি ‘জাফর ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিত।

লাশ গোসল দানকারী স্বেচ্ছাসেবী অগ্রযাত্রার সদস্য রাজু আহাম্মেদ জানান, ওই গ্রামের বাসিন্দা ও মরহুমের ভাতিজা শাহিনুর রহমানের বার বার অনুরোধের প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার বেলা ১০টার দিকে আমরা মরহুমের বাড়িতে গিয়ে দেখি উঠানে একটি খাটের উপর লাশটি রাখা রয়েছে। সকালে বৃষ্টি হচ্ছিলো। এজন্য উপরে পলিথিন টাঙানো। তবে লাশের খাটিয়ার আশেপাশে গ্রামের লোক তো নয়ই এমনকি তার স্ত্রী, ভাই, ভাবী, ভাতিজা কেউ ছিলো না। অগ্রযাত্রা টিমের আমি নিজে, অগ্রযাত্রার সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হাসান, হোমিও চিকিৎসক ফয়সাল আহমেদ, চৌগাছা শহরের একটি মসজিদের ইমাম আবু হুরাইরা লাশটিকে গোসল দিই। টিমের আজম আশরাফুল এবং মরহুমের ভাতিজা এনামুল হক শাহিন তখন আমাদের সাথে ছিলো। গোসলের পর লাশটির গায়ের পানি মুছানোর জন্য আমরা পরিবারের সদস্যদের কাছে একটি গামছা চাইলে তারা সেটিও দিতে চাইনি। যদিও কাফনের ব্যবস্থা তারাই করেছিলেন।

একপর্যায়ে আমি রাগ করে বলি ‘উনি যে প্রায় এক কোটি টাকা পাবেন, উনার যে জমি-জায়গা আছে সে ভাগ থেকে তো একটি গামছা দিতে পারেন।’ পরে এনামুল শাহিন গিয়ে জোর করে তাদের কাছ থেকে একটি গামছা নিয়ে আসলে লাশটি মোছানো হয়।

গ্রামের কেউ না আসায় জানাজা আমি নিজে পড়াতে উদ্যোগি হই। তখন গ্রামের একজন মুরব্বী জানাজা পড়ান। এসময় আসেপাশের কয়েকজন জানাজায় অংশ নেন। জানাজার পর লাশটি দাফনের জন্য কবরস্থানে নেয়ার পূর্ব মুহুর্তে তার স্ত্রী এসে লাশের মুখ দেখতে চান। আমি কিছুটা রাগে তাকেও দেখাতে চাচ্ছিলাম না। পরে আমাদের অগ্রযাত্রার সদস্য ফয়সাল তাকে লাশের মুখ দেখান। এরপর আমরা খাটিয়া বহন করে লাশ কবরস্থানে নিয়ে দাফন করি। এসময় তার ভাই আবু জাফর থাকলেও তিনি লাশের খাটিয়া ধরা বা কবরের কাছে যান নি।

মরহুমের ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে এনামুল হক শাহিন এসব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আমরা চৌগাছা শহরে অবস্থান করি। আমার আব্বা খুবই অসুস্থ। তারপরও ভোরবেলা সংবাদ শুনেই আমি গ্রামে চলে যাই। গ্রামে গিয়ে দেখি লাশটি বাড়ির উঠানে একটি খাটের উপর রাখা আছে। বৃষ্টি হওয়ায় উপরে পলিথিন টানানো। লাশটির আশেপাশেও কেউ নেই। আমি নিজে বার বার ফোন করে ‘অগ্রযাত্রা’ সদস্যদের নিয়ে যাই। মরহুম আমার বাবার আপন মামাতো ভাই হোন। তাদের এমন আচরন দেখে খুবই মর্মাহত হয়েছি। এমনকি গ্রামেই বাড়িতে থাকা আমার আপন চাচাও সেখানে যাননি। এক পর্যায়ে রাগ করে বলেছিলাম ‘লাশ দাফন করারই দরকার নেই, উপরেই থাকুক।’ তবুও তাদের বোধদয় হয়নি।

বাড়ির নারীরা আমার চাচী, ভাবী হোন। তাদের কাছ থেকে আমি নিজে জোরাজুরি করে গামছা এনে লাশ গোসল দানকারীদের দিই। তিনি বলেন, ওলিয়ার বয়সে আমার ছোটো। সে খুবই ভালো ছেলে ছিলো। পরিবারের জন্যও সে অনেক করেছে। একজন ভাই বিদেশে, আরেকজন ঢাকায় থাকায় আসতে পারেন নি। তবে সহোদর ছাড়া অন্য ভাইদের আচরণও আমাকে ব্যথিত করেছে। আল্লাহ এমন মৃত্যু যেনো কাউকে না দেন। আপনজনদের এমন আচরণের স্বীকার যেনো কারো না হতে হয়।

স্বাআলো/এস