স্থলবন্দরের কম্পিউটার অপারেটর থেকে ৫০০ কোটি টাকার মালিক!

ঢাকা অফিস: নুরুল ইসলামের বয়স চল্লিশ বছর। টেকনাফ স্থলবন্দর কাস্টমসের সাবেক কম্পিউটার অপারেটর। ২০০১ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মোট ৮ বছর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে চাকরি করেছেন তিনি। বর্তমানে শুধুমাত্র তার নামেই ৫০০ কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে। এছাড়া বেনামে সম্পত্তির তথ্যও পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ভোরে রাতে তাকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

র‌্যাব জানিয়েছে, নুরুল ইসলাম শত শত কোটি টাকার মালিক। অবৈধ উপায়ে তিনি এসব টাকা উপার্জন করেছেন। প্রায় এক বছর ধরে তার পেছনে অনুসন্ধান করেছে র‌্যাবসহ একটি গোয়েন্দা সংস্থা। প্রশ্ন উঠেছে, কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি করে কীভাবে অঢেল সম্পত্তির মালিক হলেন তিনি? তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার পর অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, নুরুল ইসলাম অন্তত ৫০০ কোটি টাকার মালিক!

‘শরিয়তসম্মত’ ব্যবসার নামে প্রতারণা

নুরুল ইসলামের বাড়ি ভোলার ধনিয়া গ্রামে। চাকরিতে ঢোকার আগে এলাকায় ছোট আকারে ঠিকাদারি করতেন তিনি। তারা পাঁচ ভাই ও তিন বোন। এর মধ্যে নুরুল ইসলাম মেজো। তিনি পড়াশোনা করেছেন মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজে।

অভিযোগ রয়েছে, ২০ বছর আগে চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার পর পরই তিনি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হতে শুরু করেন। ঢাকায় কেনা শুরু করেন জমি ও বাড়ি। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর ও ঢাকা উদ্যান এলাকায় অন্তত ১৫টি বাড়ি ও প্লটের সন্ধান পাওয়া গেছে। এছাড়া তার নামে কয়েকশ দোকান থাকার তথ্যও মিলেছে। এসব বাড়ি ও দোকানের সত্যতা যাচাই করতে সরেজমিনে যায় এই প্রতিবেদক। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এসব সম্পত্তির বিস্তারিত তথ্য।

তথ্যনুযায়ী, ঢাকা উদ্যানের একতা হাউজিং দ্বিতীয় প্রকল্পে ৪৪ ও ৪৫ নম্বর প্লটটি নুরুল ইসলামের নামে কেনা। বাউন্ডারি দিয়ে দুই প্লটে মোট ৭ কাঠা জমি রয়েছে তার নামে, যার দাম প্রায় ৪ কোটি টাকা। ঢাকা উদ্যানের ডি-ব্লকের ৩ নম্বর রোডের ৩৫ নম্বর বাসাটিও তার। এখানে আরো ১০ কাঠা জমি রয়েছে। এছাড়া আছে একটি পাকা বাড়ি। এই বাড়ি থেকে তিনি ভাড়া পান প্রতিমাসে অন্তত ৩ লাখ টাকা। বাড়ির নিচে তার নামে ১৬টি দোকান রয়েছে। এই বাড়ি ও প্লটের দাম অন্তত ৮ কোটি টাকা। ঢাকা উদ্যানের একতা হাউজিং প্রকল্পের ২ নম্বর রোডের ২২ নম্বর প্লটটি তার। সেখানেও পৌনে ৬ কাঠা জমি রয়েছে নুরুল ইসলামের। বাউন্ডারি ঘেরা এই জমির দাম কমপক্ষে ৪ কোটি টাকা। একতা হাউজিংয়ের দ্বিতীয় প্রকল্পে ৭ নম্বর রোডে সিকদার জেনারেল স্টোরের উল্টোদিকে ডানপাশে নারিকেল গাছ ঘেরা প্লটটি তার। এই প্লটটি ৪ কাঠার। দাম কমপক্ষে ৩ কোটি টাকা। একতা হাউজিংয়ের ৪ নম্বর রোডের ৬৬ নম্বর বাসার প্লটটি তার কেনা। এখানে একটি তিন তলা বাড়ি আছে। আড়াই কাঠা জমির ওপর এই বাড়িটির দাম ৫ কোটি টাকা।

আরো জানা যায়, ঢাকা উদ্যানের প্রধান সড়কে ২২ নম্বর প্লটে ৮ কাঠার জমিটি নুরুল ইসলামের নামে কেনা। এখানে দুইতলা বিশিষ্ট বাড়ি রয়েছে। এখানে তার সাতটি দোকান রয়েছে। সবমিলিয়ে এটি দাম অন্তত ১০ কোটি টাকা। চন্দ্রিমা ৭ নম্বর রোডের ১০ নম্বর বাড়িটি তার। বাড়িটি ২ কাঠা জমি ওপর। দাম ২ কোটি টাকা। ঢাকা উদ্যানের দিল মোহাম্মদ রোডে উন্নতি প্রশান্তি হাসপাতালের জমি ও ভবনটি তার। ৭ তলা বাড়িটিতে ৭টি দোকান রয়েছে। বাড়ি ও জমির দাম অন্তত ১৫ কোটি টাকা। নবোদয় হাউজিংয়ের ডি ব্লকের ৩ নম্বর রোডের ৮ নম্বর বাড়িটির মালিকও তিনি। সাড়ে ৩ কাঠা জমির ওপর ৭ তলা বাড়ি রয়েছে এখানে। এটির দাম অন্তত ১০ কোটি টাকা। এছাড়া নান্দনিক এই বাড়ি তৈরি করতে খরচ হয়েছে অন্তত ৫ কোটি টাকা। ঢাকা উদ্যানের বি ব্লকে ২ নম্বর সড়কের ৮ নম্বর বাড়িটি কম্পিউটার অপারেটর নুরুল ইসলামের। এখানে আড়াই কাঠার প্লট রয়েছে। যার দাম আড়াই কোটি টাকার মতো। নবীনগর হাউজিংয়ের ৮ নম্বর রোডেও ৬ কাঠার একটি প্লট আছে তার নামে। এখানে বেশ কয়েকটি দোকান রয়েছে। মদিনা ইঞ্জিনিয়ার্স নামে একটি গ্যারেজ আছে। এছাড়া আছে একটি রিকশা গ্যারেজও।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, ঢাকা উদ্যানে নদীর ওপারে সিলিকন হাউজিংয়ে নুরুল ইসলামে অন্তত তিন একর জমি আছে। এর বাইরে কক্সবাজার এবং টেকনাফেও নুরুল ইসলামের জমি আছে। ঢাকায় নামে-বেনামে তার বাড়ি ও প্লট আছে। এছাড়া নুরুল ইসলামের স্ত্রীর নামে বাড়ি-জমি রয়েছে। রয়েছে স্ত্রীর একাধিক ব্যাংক একাউন্টে কোটি কোটি টাকা ও এফডিআর।

মদিনা ইঞ্জিনিয়ার্সের কর্মচারী আলামিন বলেন, এই মালিক ঢাকায় থাকে না। শুনেছি বাড়িওয়ালার অনেক জমি ও বাড়ি আছে।

ঢাকায় তার জমি কেনাবেচায় সহযোগিতা করেন তার ম্যানেজার বাবুল। নুরুল ইসলামের একটি বাড়িতে থাকেন তিনি। দোকানের ভাড়া তোলা থেকে জমি-প্লট দেখাশোনার দায়িত্বও তার। বাবুলের নামেও একাধিক অ্যাকাউন্ট আছে। যার মাধ্যমে নুরুল ইসলাম টাকা পাঠাতেন। বাবুলের স্ত্রীর নামেও একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।

ম্যানেজার বাবুল বলেন, এসব সম্পত্তি নুরুল ইসলাম কিনেছেন। আমি শুধু দেখাশোনা করি। বিস্তারিত জানতে হলে মালিকের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

আরেক ম্যানেজার মোল্লা বলেন,‘নুরুল ইসলাম বেশিরভাগ সময় টেকনাফে থাকেন। তবে প্রতি সপ্তাহে ঢাকায় আসেন। শুনেছি তিনি সেখানে চাকরির পাশাপাশি আমদানি-রফতানির ব্যবসা করতেন।

এদিকে টেকনাফ কাস্টমসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন নামে তার অন্তত ৩০টি ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। যেগুলো ভাড়া দিয়ে তিনি টাকা উপার্জন করেন। এই ট্রেড লাইসেন্সগুলো দিয়ে বন্দরের মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে পণ্য আমদানি করা হয়। যেখান থেকে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। এছাড়া অন্যদের অবৈধ মালামাল পার করে দেয়ার জন্যও আলাদাভাবে টাকা নেন তিনি।

টেকনাফ বন্দর কাস্টমসের এক কর্মচারী বলেন, বন্দরের সবকিছু দখলে তার। কেউ তার ওপরে কথা বলতে পারেন না। কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মেম্বার-চেয়ারম্যান পর্যন্ত টাকা দিয়ে ম্যানেজ করেন তিনি। যে কারণে অল্প সময়ে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।

নুরুল ইসলামের সম্পর্কে ভোলা সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এমদাদ হোসেন কবির বলেন, প্রায় ২০ বছর আগে তাদের বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এরপর তারা স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে যায়। তারা এখানে থাকে না। নুরুল ইসলামের এক বোনকে ধনিয়াতে বিয়ে দিয়েছিলেন। সেই বোনের বাড়িতে তার বাবার যাতায়াত রয়েছে।

অবৈধ সম্পত্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান বলেন, শুনেছি ঢাকায় তাদের অনেক বাড়ি ও গাড়ি রয়েছে। তারা নাকি এখন অনেক বড় লোক।

নুরুল ইসলাম চাকরিতে প্রবেশের সময় তাদের পরিবারের অবস্থা ভালো ছিলো না। চাকরিতে ঢোকার পরে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। তিনি তার মামাতো ভাই ওরফে বোন জামাইকেও প্রভাব খাটিয়ে চাকরি দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্বাআলো/এসএ