বিশ্বজুড়ে খাদ্য অপচয়ের ফ্যাশন বদলাতে হবে

সম্পাদকীয়: যখন ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ার কথা জোরেসোওে বলা হচ্ছে ঠিক তখনই জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও এক উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে বিশ্ব জুড়ে যে খাদ্য সংকট চলছে তার জন্য দায়ী উৎপাদন ঘাটতি নয়, দায়ী অপচয়। বিশ্বের ১১ শতাংশ মানুষের ক্ষুধা বেড়েছে। সম্পদের স্বল্পতা নয়, খাদ্যের অপচয়ই বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার প্রধান কারণ।

মানুষের জন্য উৎপাদিত খাবারের মধ্যে অপচয় হয় ১৩০ কোটি টন (মোট উৎপাদনের এক তৃতীয়াংশ) খাবার। বিশ্বের সামগ্রিক উৎপাদিত খাদ্যশস্যকে বিবেচনায় নিলে এই অপচয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় অর্ধেক। এফএও-এর তথ্য অনুযায়ী উৎসবের দিনগুলোতে অপচয়ের পরিমাণ আরো বেড়ে যায়।

পরিসংখ্যান বলছে, সবচেয়ে বেশি খাবার নষ্ট হয় পশ্চিমা দেশগুলোতে। সেখানকার ধনী দেশগুলোর ক্রেতারা প্রতিবছর ২২ কোটি ২০ লাখ টন খাবার অপচয় করে থাকে। পুরো সাব সাহারান অঞ্চলে যে পরিমাণ খাবার উৎপাদিত হয়, পশ্চিমা দেশগুলোর অপচয়ের পরিমাণ তার সমান।

এফএও-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইউরোপ আর উত্তর আমেরিকার ক্রেতারা মাথাপিছু বার্ষিক ৯৫ থেকে ১১৫ কেজি পর্যন্ত খাবার অপচয় করে থাকেন। আফ্রিকার সাব সাহারা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্রেতাদের ক্ষেত্রে যার বার্ষিক পরিমাণ ৬ থেকে ১১ কেজি। অপচয়ের আরো ভয়ঙ্কর চিত্র রয়েছে। এফএও-এর তথ্য অনুযায়ী এই বিপুল অপচয়ের বিপরীতে পৃথিবীর ৭৯ কোটি ৫০ লাখ মানুষ প্রচন্ড অপুষ্টিতে ভুগছে।
অবশ্য পশ্চিমা দেশগুলোতেও বিপুল সংখ্যক মানুষ না খেয়ে থাকতে বাধ্য হয়। চ্যারিটি সংগঠন ডবি-উআরএপি-এর তথ্যমতে, যুক্তরাজ্যে এককভাবেই ৮৪ লাখ মানুষ একবেলা খাবার যোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে। আর সেই দেশেই প্রতিবছর কয়েকশ কোটি টাকার খাবার অপচয় হয়।

আর সব পণ্যের মতো খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও উৎপাদিত দ্রব্য কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। সব পর্যায়েই খাদ্য অপচয়ের নজির রয়েছে। তবে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও ওসেনিয়ার মতো পশ্চিমা দেশগুলোর ক্ষেত্রে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর পরই বেশি পরিমাণে খাদ্য অপচয় হয়।

এসব সন্তানরা নরকের কীট

অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোতেও খাবার অপচয়ের ঘটনা ঘটে। তবে ধনী দেশগুলোর মতো নয়। হালে নব্য ধনীরা খাদ্য অপচয়কে একটা ফ্যাশন বলে মনে করেন। ইসলামী বিধান অনুযায়ী খাওয়া শেষে প্লেটটি চেটে খাওয়া সুন্নত। এখানে ধর্মের আনুগত্য থাক আর না থাক খাদ্যেও শিক্ষাটি যে সুন্দর তাথে কোনো বিতর্ক থাকার কথা নয়। কিন্তু আমাদের মতো দরিদ্র দেশেও দেখা যাচ্ছে হালে প্লেট চেটে খাওয়াকে ছোটলোকী ভাবা হচ্ছে। ক্ষুধা লাগলে খেতে হবে এবং ক্ষুধা থাকতে খাওয়া বন্ধ করতে হবে তাহলে রোগ ব্যাধি যেমন কম হবে তেমনি খাদ্য অপচয়ও হবে না। কিন্তু এ সব নীতি কথা শোনার মতো মানুষের সংখ্যা খুবই কম। আর তাই এখন বিশ্ব সংস্থা খাদ্য ঘাটতির কারণ অনুসন্ধানে নামতে বাধ্য হয়েছে। আফ্রিকার দেশ কেনিয়ায় ৩০ লাখ মানুষ ভর্তূকি আর মানবিক সহায়তার ওপর ভর করে বেঁচে থাকতে বাধ্য হয়। অথচ দেশটিতে বড়দিন আর নববর্ষ উপলক্ষে তৈরি করা খাবারের এক-তৃতীয়াংশ নষ্ট হওয়ার কথা জানিয়েছে এফএও। এই পরিসংখ্যানিক তথ্যকে উপজীব্য করে তারা বিশ্বব্যাপী একটি প্রচারণাও শুরু করেছে।

এফএও-এর প্রচারণায় বলা হচ্ছে, খাবার উপভোগের জন্য ছুটির দিনগুলো সত্যিই খুব যথাযথ সময়। খাবার উপভোগের ব্যাপারটিকেও আমরা স্বাগত জানাই। তবে বিশ্বের এক প্রান্তে খাদ্যের অপচয় হয় বলেই অন্য প্রান্তে ক্ষুধার হাহাকার থামে না।

স্বাআলো/আরবিএ