নিয়মের মধ্যে না থাকলে শিশুরা বিশৃঙ্খল হয়

সম্পাদকীয়: নিয়মের মধ্যে থেকেও মানুষ মুক্তচিন্তার, উদার মানসিকতার হতে পারে৷ বাড়িতে কিছু নিয়ম-কানুন আর শাসন থাকলে সন্তানরা যে কোনো জায়গায় সহজে খাপ খাওয়াতে পারে৷ যাদের বাড়িতে নিয়মের কোনো বালাই নেই, তাদের সন্তানদের কর্মজীবনেও নিয়ম মেনে চলতে অসুবিধা হয়।

বর্তমান প্রজন্ম যেন সঠিকভাবে গড়ে ওঠছে না। এ বিষয়ে সবাই কমবেশি উদ্বিগ্ন। ছোটরা আর আগের মতো বড়দের শ্রদ্ধা করে না এরকম কথা আজকাল প্রায়ই শোনা যায়। এ নিয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য আসছে। কেউ বলছেন তথ্য-প্রযুক্তি এর জন্য দায়ী। কেউ বলছেন টিভির কারণে শিশুরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আবার কেউ বলছেন মোবাইলে সর্বনাশটা করছে। শিশুদের লালন-পালন বিষয়ক জার্মানীর গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ফোর্সা’ এক সমীক্ষা প্রকাশ করেছে। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, জার্মানির কিন্ডার গার্টেন বা শিশুদের স্কুলের শিক্ষকরাও শিশুদের আচরণে সন্তুষ্ট নন৷ কেন এমনটা হচ্ছে এবং কিভাবে এর সমাধান সম্ভব তাই তারা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছেন।

ফোর্সার গবেষণায় দেখা গেছে, কিন্ডার গার্টেনের তিন বছরের শিশুদের যা করতে বলা হয় তাই করার কথা, কিন্তু না, ওরা নিজের ইচ্ছা মতোই খেলছে, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক যা বলছেন শিশুরা ঠিক তার উল্টোটা করছে৷ অথচ শিক্ষক তেমন কিছুই বলতে পারছেন না৷ এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটছে বলে জানিয়েছেন কিন্ডার গার্টেনের একজন শিক্ষক৷ প্রাইমারি স্কুলেও প্রায় একই অবস্থা৷ শিক্ষকের কথা শুনতে পাচ্ছে না এমন ভাব আজকাল অনেক শিশুর মধ্যেই লক্ষ্য করা যায়৷

সমীক্ষায় বলা হয়, শিক্ষক এবং শিশু লালন-পালন বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফোর্সা’র করা এক সমীক্ষায় জানা যায়, আজকের শিশুদের মধ্যে অমনোযোগিতা, অভদ্র আচরণ এবং সামাজিকভাবে মিশতে অক্ষমতা লক্ষ্য করা যায়৷ অনেক বাড়িতেই সেরকম কোনো নিয়ম কানুন নেই৷ কারণ, তারা মনে করেন, বাড়িতে বেশি শাসন করলে শিশুরা মুক্তভাবে বড় হতে পারবে না, কিংবা শাসন শিশুদের স্বাধীন চিন্তার মানুষ হওয়া কঠিন করবে৷

বিশ্বজুড়ে খাদ্য অপচয়ের ফ্যাশন বদলাতে হবে

সন্তানকে আগের দিনের মতো শাসন করা উচিত, সন্তানের সব ইচ্ছা মেনে নেয়া সন্তান মানুষ করার সঠিক পন্থা নয় এমনটি অনেক শিশুও মনে করে। সমীক্ষাটি করা হয়েছে আট থেকে ১৫ বছর বয়সি ছেলে-মেয়েদের নিয়ে৷ সেখানে অনেক শিশুই বলেছে এ কথা৷

এ বিষয়ে পরিবার বিষয়ক জার্মান এক বিশেষজ্ঞ বেশ স্পষ্ট করেই বলেছেন, বড়দের প্রতি সম্মান দেখানো এবং তাদের শ্রদ্ধা করা শৈশব থেকেই শিখতে হয়৷ শিখতে হয় শাসন মেনে নেয়া। তাছাড়া শাসন করতে গিয়ে যখন ‘না’ করা হয়, সেই ‘না’ মেনে নেয়াও শিখতে হয়৷ যদিও এই ‘না’ করার কারণে মা, বাবা অনেক সময় সন্তানের কাছে সাময়িকভাবে অপ্রিয়ও হতে পারেন৷

শিশুরা হোমওয়ার্ক থেকে শুরু করে সারাদিন আর কী কী করবে তার একটা তালিকা করে দেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ রাতের খাবার একসাথে খাওয়া উচিত, যাতে সারাদিন কে কী করেছে তা নিয়ে আলোচনা করা যায়৷ নিয়ম তৈরি করে দেয়া মানে নিজের সন্তানকে নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা দেয়া৷

শিশুরা পরিবারের কারণে বিভ্রান্ত হচ্ছে। কৌতুহলী শিশু মন অনেক কিছু করতে চায়। কিন্তু তারা তো আর ভালো-মন্দ চিন্তা করতে শেখেনি। তাদের বিচার বুদ্ধিও হয়নি। তাহলে তাদের মন যা চাইবে তাতে যদি ‘শিশুদের হ্যাঁ বলুন’ শ্লোগানে সুর মিলিয়ে সব কাজেই হ্যাঁ বলা হয় তাহলে বিপত্তি। ঘটছেও তাই। হাল আমলের মায়েদের মাঝে একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যে, তারা তাদের সন্তানদের কোনো কিছুতেই না বলছেন না। এর ফলে শৈশব থেকে শিশুরা গড়ে ওঠছে বাধাহীনভাবে যা পরবর্তীতে তারা যখন বয়োপ্রাপ্ত হচ্ছে তখন কারো মতের সাথে নিজের মতের সমন্বয় করতে পারছে না। আগের আমলের অশিক্ষিত মায়েরা তাদের সন্তান আদর-সোহাগ দিয়ে লালন-পালন করেছেন। তাই শিশুরা যখন বড় হয়েছে তখন সব কিছুতেই সে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে। বাড়িতে ভিক্ষুক আসলে শিশুকে দিয়ে ভিক্ষা দেয়ার শিক্ষা হলো মানুষের উপকার করতে শেখানো। ছোটদের সাথে ভাগ করে খাওয়ার মাধ্যমে আত্মকেন্দ্রিক না হওয়ার শিক্ষা পায় শিশুরা। এসব কিন্তু আজকার উঠে গেছে। যার পরিণতিতে শিশুরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গড়ে ওঠছে। এ ক্ষেত্রে জামার্নির গবেষণা অনেকটাই বাস্তব সম্মত।

স্বাআলো/আরবিএ

.

Author