স্বাস্থ্যসম্মত শুটকি উৎপাদনে দ্বীপটিতে ছাড়া হলো ৬ লাখ বন্ধ্যা মাছি

কক্সবাজার প্রতিনিধি: স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ শুটকি উৎপাদনের জন্য সোনাদিয়া দ্বীপে আরো তিন লাখ বন্ধ্যা মাছি অবমুক্ত করা হয়েছে। মঙ্গলবার স্থানীয় সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই মাছিগুলো অবমুক্ত করেন। এর আগে গত ১ ও ১৫ ডিসেম্বর যথাক্রমে এক ও তিন লাখ বন্ধ্যা মাছি অবমুক্ত করা হয়।

কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপে অর্গেনিক উপায়ে স্বাস্থ্যসম্মত শুটকি মাছ প্রক্রিয়াজাত করে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর অথবা কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সরাসরি বিদেশে রপ্তানী করা হবে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক। মাছি অবমুক্তকরণ অনুষ্ঠানে তিনি এই কথা জানান।

ক্ষতিকর মাছির উপদ্রবমুক্ত রাকতে শুটকিতে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশক মেশানোর অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিনের। শুটকি উৎপাদকদের এই বিপদজনক পন্থা থেকে সরাতে পরিবেশসম্মত এই পরমাণু প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে জানান বিজ্ঞানীরা।

কক্সবাজারে এবার স্কুলছাত্রীকে হোটেলে আটকে রেখে ধর্ষণ

মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সোনাদিয়া দ্বীপের বিভিন্ন শুটকি মহালে বন্ধ্যামাছি অবমুক্তকালে উপস্থিত ছিলেন পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান খাদ্য ও বিকিরণ জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের বিকিরণ কীটতত্ত্ব ও মাকড়তত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. এটিএম ফয়েজুল ইসলাম, পরমাণু শক্তি কমিশনের কক্সবাজারস্থ সৈকত খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্রের পরিচালক ড. মাসুদ করিম, অর্গানিক গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান কৃষিবিদ কায়সারউদ্দিন আহমদ, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইসমাইল জবিউল্লাহ প্রমুখ।

পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান খাদ্য ও বিকিরণ জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের বিকিরণ কীটতত্ত্ব ও মাকড়তত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. এটিএম ফয়েজুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি হলো এক ধরনের জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি।
এ পদ্ধতিতে কোন এলাকায় বন্য মাছির কয়েকগুণ বন্ধ্যামাছি ছাড়া হয়। এরপর বন্ধ্যা মাছির সাথে ক্ষতিকর মাছির মেলামেশা হলে সেই বন্য মাছির ডিম জন্ম হয় না, অথবা সামান্য ডিম দিলেও তা থেকে আর বাচ্চা ফোটে না। কারণ স্টেরাইল করা বন্ধ্যামাছির সাথে বন্য মাছি মিলিত হলেই তার শরীরের জনন ইন্দ্রিয় কার্যক্ষমতা হারায়। এভাবে ধীরে ধীরে ক্ষতিকর বন্য মাছির বংশ কমে যায়। তবে ক্ষতিকর মাছির নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতি মাসে দুই বার করে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হয়। এরই অংশ হিসাবে মঙ্গলবার চলতি মৌসুমে তৃতীয় বারের মতো বন্ধ্যামাছি অবমুক্ত করা হয়েছে।

শুটকিতে যাতে কোন সময় বিষ প্রয়োগ করা না হয়, সেজন্য স্থানীয় শুটকি উৎপাদকদের শপথ করান এমপি আশেকউল্লাহ রফিক। এসময় তিনি সোনাদিয়ার শুটকি নিয়মিত সংগ্রহ করে তা পরমাণু শক্তি কমিশনে পরীক্ষা করে দেখবেন বলেও হুশিয়ার করে দেন।

তবে বন্ধ্যামাছি ছাড়ার পর সোনাদিয়ায় শুটকি তৈরিতে এখন কোন বিষ বা লবণ প্রয়োগ করতে হয় না বলে জানান স্থানীয় শুটকি উৎপাদকরা।

কক্সবাজারে পর্যটক ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত ৩ জন শনাক্ত

পরমাণু শক্তি কমিশনের কক্সবাজারস্থ সৈকত খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্রের পরিচালক ড. মাসুদ করিম জানান, এ বন্ধ্যাকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করেই মাছি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কক্সবাজারে শুটকির উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তারই লক্ষ্যে ইতোমধ্যে শহরের কলাতলীস্থ সৈকত খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্রে প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয়েছে একটি গবেষণাগার ও প্রযুক্তি কেন্দ্র। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের উদ্ভাবিত এই পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিবছর শুটকির উৎপাদন প্রায় এক তৃতীয়াংশ বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন সামুদ্রিক ও স্বাদু পানির মাছ উৎপাদিত হয়। যার মধ্যে প্রায় ১৫% মাছকে সূর্যের তাপে শুকিয়ে শুটকীতে রূপান্তর করা হয়। তবে মাছ রোদে শুকানোর সময় লিওসিনিয়া কাপ্রিয়া নামের এক প্রজাতির ক্ষতিকারক মাছির আক্রমণে প্রায় ৩০% শুটকিই নষ্ট হয়ে যায়। আর এই মাছির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য শুটকি উৎপাদকরা মাছে বিষ অথবা অতিরিক্ত লবণ প্রয়োগ করেন। যার ফলে ভোক্তা ও উৎপাদক উভয়েরই স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হয়। আবার এ কারণে শুটকির গুণগত মানও কমে যায়। যার ফলে বাজার মূল্য কমে যায়। এসব বিবেচনা করে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন মাছি বন্ধ্যাকরণ পদ্ধতির মাধ্যমে শুটকি মাছের ক্ষতিকর পোকা দমনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে।

স্বাআলো/ডিএম

.

Author