যশোরের প্রথম নারী সংসদ সদস্য ইসমাত আরা সাদেকের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আব্দুল্লাহ আল ফুয়াদ, কেশবপুর: মানুষ চলে যাওয়ার পরও থেকে যায় তার স্মৃতি থেকে যায় তার ভালোবাসা পূর্ণ ব্যবহার যা কখনো ভোলা যায় না । ২০২০ সালের ২১ জানুয়ারি মঙ্গলবার তেমনই এক নক্ষত্রের পতন ঘটেছিলো তিনি হলেন কেশবপুরের সংসদ সদস্য ও সাবেক জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক।

শুক্রবার (২১ জানুয়ারি) দ্বিতীয় মৃত্যূবার্ষিকী উপলক্ষে তার পরিবারের উদ্যোগে ঢাকাস্থ টঙ্গী মাহমুদনগর জামিয়া সোবহানীয়া এতিম খানা মাদরাসায় দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দেশের এক ক্রান্তিলগ্নে জীবনের মায়া ত্যাগ করে কেশবপুরের মানুষের কথা ভেবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা মার্কার প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটে জয় লাভ করেছিলেন। কেশবপুরের মানুষের জীবনমানের উন্নয়নের লক্ষে যিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। বার্ধক্যজনিত কারণে ২০২০ সালের মঙ্গলবার (২১ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন, রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ও আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তার পরদিন বুধবার সকাল সাড়ে দশটায় ঢাকা থেকে হেলিকপ্টার যোগে তার মরদেহ কেশবপুর সরকারি কলেজ মাঠে নিয়ে আনা হয় এবং সকাল ১১টায় কেশবপুর পাবলিক মাঠে দ্বিতীয় জানাজা নামাজ শেষে তার নিজ জন্মস্থান বগুড়ার পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন করা হয়।

কেশবপুরে আওয়ামী লীগের পুরনো কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি গঠন

সাবেক শিক্ষামন্ত্রী প্রয়াত এএসএইচকে সাদেকের সহধর্মিনী ইসমাত আরা সাদেক ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনে যশোর-৬ (কেশবপুর) আসন থেকে আওয়ামী লীগের টিকিটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনিই প্রথম যশোর থেকে সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্য হন। বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তাকে প্রথমে গণশিক্ষা ও পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করেন।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুণরায় যশোর-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

ইসমাত আরা সাদেক ১৯৪২ সালের ১২ ডিসেম্বর বগুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মাহবুবুর রহমান চৌধুরী এবং মাতার নাম সাযেরা খাতুন। তিনি ১৯৫৬ সালে বগুড়া ভিএম গার্লস স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন ও ১৯৫৮ সালে ঢাকার হলিক্রস কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬০ সালে তিনি ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯২ সালে তিনি ও তার স্বামী এএসএইচকে সাদেক আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৯৬ সালে তিনি কেশবপুর মহিলা আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তখন থেকে তিনি যশোর জেলার আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির ১ নম্বর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ মহিলা কল্যাণ পরিষদের সদস্য ছিলেন। ইসমাত আরা সাদেক দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৬ কেশবপুর আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি তারিখে নতুন সরকার গঠিত হলে তাকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করা হয়। পরবর্তীতে, ২০১৪ সালের ১৫ জানুয়ারি তারিখে তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

কেশবপুরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ছমির উদ্দীনের দাফন সম্পন্ন

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। ইসমাত আরা সাদেকের স্বামী এএসএইচকে সাদেক সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য ছিলেন। সাবেক এই সচিব আওয়ামী লীগ থেকে দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ব্যক্তিগত জীবনে ইসমাত আরা এক ছেলে এবং এক মেয়ের জননী। তার ছেলে তানভীর সাদেক কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার এবং মেয়ে নওরীন সাদেক একজন স্থপতি প্রকৌশলী। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে কেশবপুরে তার নিজ নির্বাচনী এলাকায়।

গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর এই উপজেলা নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসনে এমপি নির্বাচিত হন মরহুম এ এস এইচ কে সাদেকের স্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক। মন্ত্রিসভায় তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। প্রতিমন্ত্রী হয়েই তিনি কেশবপুরের উন্নয়নের ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি প্রথমেই বিশেষ বিশেষ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে নিয়ে আসেন অরাজনৈতিক বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষকে। তার এলাকার শিক্ষাঙ্গনে দুর্নীতি বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় মনোযোগী করে তোলার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। অবসরপ্রাপ্ত ভালমানের শিক্ষকমন্ডলীর মাধ্যমে নিয়োগ সংক্রান্ত যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করেন। জেলা প্রশাসক বা তার প্রতিনিধি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের উপস্থিতিতে যাচাই-বাছাই কমিটি তাৎক্ষণিক প্রশ্ন করেন। লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর পেলে তার মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে একই দিনে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। ফলে দুর্নীতির মাধ্যমে দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগের বিন্দুমাত্র সুযোগ এখানে রহিত হয়ে যায়। এটি বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ বা বেসরকারি শিক্ষা সংস্কারের একটি মডেল।

তিনি আরো যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, প্রতি স্তরে ভর্তির জন্য পরীক্ষা, অনুত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের উচ্চতর স্তরে ভর্তি বা পরীক্ষায় অংশ গ্রহণে বিরত রাখা, শ্রেণিকক্ষে ছয় ঘণ্টা পাঠদান নিশ্চিত করা, অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্রীড়া-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালু রাখা, আন্তঃস্কুল খেলা ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা চালু করা এবং মধ্যাহ্নকালীন টিফিনের ব্যবস্থা করা।

তার এই উদ্যোগের কারণে কেশবপুরের শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এছাড়াও তিনি, কেশবপুরের স্কুল কলেজের নতুন ভবন নির্মাণ, জাতীয় শহীদ মিনারের আদলে কেশবপুর শহীদ মিনার নির্মাণ, বিধবা ও বয়স্ক ভাতা, বাল্যবিবাহ ও শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া দূর করতে বাইকেল বিতরণ, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ, কপোতাক্ষ নদ ও বুড়িভদ্রা নদ খনন এবং গ্রামীন সড়কের উন্নয়নসহ প্রতিটা সেক্টরে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করেছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে তার একমাত্র মেয়ে প্রকৌশলী নওরীণ সাদেক কেশবপুরবাসীর কাছে তার বাবা ও মায়ের জন্য দোয়া প্রার্থনা করেছেন।

স্বাআলো/এস

.