বড় আঘাত গ্যাস ও জ্বালানির বাজারে, বাড়ছে দাম যেসব পণ্যের

ঢাকা অফিস: ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর থেকেই সরবরাহ উদ্বেগে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি, সোনা, গমসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম ব্যাপক হারে বেড়েছে। হামলা শুরুর পরপরই আজভ সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্থগিত করেছে রাশিয়া। এটি কৃষ্ণ সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে ইউক্রেনের বন্দরগুলো। দেশটির খাদ্যশস্য রফতানির ৯০ শতাংশই যায় সমুদ্রপথে।

ফলে সরবরাহব্যবস্থা এরই মধ্যে বিঘ্নিত হওয়ায় খাদ্যপণ্যের দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

এ যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে সতর্ক করে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) পরিচালক এনগোজি ওকোঞ্জো আইওয়ালা বলেন, ইউক্রেন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গম রফতানিকারক দেশ। তাই এ দেশটির গম সরবরাহ যদি বিঘ্নিত হয় তাহলে গম ও রুটির দাম বেড়ে যাবে। সাধারণ মানুষ বিপদে পড়বে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, এ যুদ্ধ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করবে।

বড় আঘাত গ্যাস ও জ্বালানির বাজারে

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে জ্বালানির বাজারে। গত বৃহস্পতিবার এক দিনেই জ্বালানি তেলের দাম ৮ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৫ ডলারে উঠে এসেছে। এর পাশাপাশি ইউরোপে গ্যাসের দামও ওই দিন ৫১ শতাংশ বেড়ে যায়। যদিও গত শুক্রবার তেল ও গ্যাসের দাম কিছুটা কমেছে।

কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দ্বিতীয় বৃহৎ ও গ্যাসের শীর্ষ রফতানিকারক দেশ রাশিয়া। তাই এ যুদ্ধে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় জ্বালানির দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ওয়ান্দার বিশ্লেষক জেফরে হ্যালেই বলেন, রাশিয়ার ওপর অনেক শক্তিশালী নিষেধাজ্ঞা আসছে। এর কারণেও সাময়িকভাবে জ্বালানির দাম আরো বাড়বে।

গম সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) হিসাব অনুযায়ী বিশ্বে গম সরবরাহের ২৯ শতাংশ, ভুট্টার ১৯ শতাংশ এবং সূর্যমুখী তেলের ৮০ শতাংশ আসে ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে। এরই মধ্যে বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত গমের দাম এক-পঞ্চমাংশ বেড়ে ১০ বছরে সর্বোচ্চ হয়েছে। ভুট্টার দাম বেড়েছে ১৫ শতাংশ। ট্রেডিং ইকোনমিকসের হিসাবে গত এক সপ্তাহে গমের দাম বেড়েছে ৬ শতাংশের বেশি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি ইউক্রেন ও রাশিয়ার খাদ্যশস্য বৈশ্বিক বাজারে ঠিকভাবে না আসে তাহলে দাম আরো বেড়ে যাবে।

মস্কোর খাদ্যশস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান সভকন এর প্রধান অ্যান্দ্রে সিজভ বলেন, সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে গমের দাম এমনভাবে বাড়বে যে ২০০৭-০৮ সংকটের পর যা আর দেখা যায়নি।

বৈশ্বিক ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রপটের বিশ্লেষক ওফেলিয়া কাউটস বলেন, ইউক্রেন হচ্ছে গম ও ভুট্টার অন্যতম বড় রফতানিকারক দেশ। যদি দেশটির রফতানি কোনো কারণে ব্যাহত হয় তবে বিশ্বে এসব পণ্যের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে।

খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ জানায়, ইউক্রেনকে বলা হয় ইউরোপের রুটির ঝুড়ি। এমনকি মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশকেও তাদের গমের জন্য ইউক্রেনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। ফলে সরবরাহব্যবস্থায় কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে খাদ্য নিরাপত্তায় এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। লেবাননের গমের ৫০ শতাংশ আসে ইউক্রেন থেকে, লিবিয়ার ৪৩ শতাংশ, ইয়েমেনের চাহিদার ২২ শতাংশ এবং বাংলাদেশের চাহিদার ২১ শতাংশ আসে ইউক্রেন থেকে। মিসরের গমের ৮৬ শতাংশ আসে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে এবং তুরস্কের গমের ৭৫ শতাংশ আসে ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে।

এ ছাড়া চীনের এক-তৃতীয়াংশ ভুট্টা আমদানি হয় ইউক্রেন থেকে। সিএসআইএসের বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা বিষয়ক পরিচালক কেটলিন ওয়েলস বলেন, ১৪ দেশ ইউক্রেনের গমের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, এসব দেশের অর্ধেক এরই মধ্যে চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে।

পরিবহন ব্যয় বাড়বে

বিশ্বে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পণ্য পরিবহন খরচ বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক জলসীমায় জাহাজ চলাচলেও উদ্বেগ বেড়েছে, ফলে নিরাপত্তা বাড়াতে হবে এবং জাহাজসেবাও বিঘ্নিত হবে। এ ছাড়া দুই দেশের এ যুদ্ধে বিমান পরিবহন ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এতেও খরচ বাড়ছে।

মূল্যবান ধাতুর বাজারে প্রভাব

যুদ্ধ উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে সোনা, রুপা, তামাসহ মূল্যবান সব ধাতুর দাম বাড়ছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি লোহা, নিকেল ও কপার উৎপাদিত হয় রাশিয়া ও ইউক্রেনে। এ ছাড়া নিয়ন, প্যালাডিয়াম ও প্লাটিনামের মতো আরো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধাতু উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত এসব দেশ।

এর মধ্যেই নিকেল ও অ্যালুমিনিয়ামের দাম কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। গত ডিসেম্বর মাসের পর প্যালাডিয়ামের দাম ৮০ শতাংশ বেড়েছে।

চিপ সংকট কাটছে না

করোনা মহামারিতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় চিপ উৎপাদন। স্মার্টফোন, গাড়ি থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক অনেক পণ্যের জন্যই চিপ প্রয়োজন। ২০২১ সালে সবচেয়ে বড় সংকটের ক্ষেত্র ছিলো মাইক্রোচিপ। অনেক বিশ্লেষক বলেছিলেন, ২০২২ সালে এ সংকট কেটে যাবে, কিন্তু যুদ্ধের ফলে এ আশার বেলুন ফুটো হয়ে গেছে।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ায় মাইক্রোচিপ সরবরাহ বন্ধের হুমকি দিচ্ছে, অন্যদিকে মাইক্রোচিপের প্রয়োজনীয় উপকরণ, যেমন নিয়ন, প্যালাডিয়াম ও প্লাটিনামের উৎস হচ্ছে রাশিয়া। নিয়নের ৯০ শতাংশই জোগান দেয় রাশিয়া। ফলে চিপ সংকট কাটার আশু সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না, যা প্রযুক্তিপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। সূত্র : ফিন্যানশিয়াল টাইমস, এএফপি, রয়টার্স, ট্রেডিং ইকোনমিকস।

স্বাআলো/এসপি/কা

.

Author
ঢাকা অফিস