সব বয়সের মানুষে মুখর স্বয়ম্ভর লাইব্রেরি, বাড়ি বাড়িও পৌঁছে দেয়া হয় বই

চুয়াডাঙ্গা: করোনাভাইরাসের প্রভাবে প্রায় আড়াই বছর স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীসহ সব মানুষ গৃহবন্দী ছিলো। করোনা কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার কারণে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা স্বয়ম্ভর পাবলিক লাইব্রেরি প্রাঙ্গণ এখন শিশু-কিশোরসহ সব বয়সী মানুষে মুখর।

আলমডাঙ্গা কলেজ রোডে ২০১৪ সালে নিজ উদ্যোগে এনামুল হক নামে এক গণমাধ্যমকর্মী ভাড়াবাড়িতে স্বয়ম্ভর পাবলিক লাইব্রেরি গড়ে তোলেন। শুরুতে ৬১টি বই নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এখন বইয়ের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। আট বছরের প্রচেষ্টায় পূর্ণতা পেতে শুরু করেছে লাইব্রেরিটি। আলমডাঙ্গায় হাইরোডের জিএস টাওয়ারে নতুন আঙ্গিকে লাইব্রেরির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে নতুন নতুন পাঠক সংখ্যা। দূর দুরান্ত থেকে ছুটে আসছে শিশু কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ। প্রতিদিনই লাইব্রেরি চত্বরে চলে বই পড়া, আবৃতি, নিউজ পেপার পড়া ও আড্ডাসহ নানা কর্মযজ্ঞ। লাইব্রেরিতে রয়েছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নামী-দামী লেখকের লেখা বই।

এ লাইব্রেরির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে সদস্যদের বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয় তাদের পছন্দমত বই ।

শনিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বিকালে লাইব্রেরিতে পড়তে আসা আলমডাঙ্গা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র বিক্রম মজুমদার বলে, লাইব্রেরিতে বই পড়ে মজা পায় তাই লাইব্রেরিতে আসি। এই বই পড়ে যা শিখেছি বই পড়ার আগে তা জানতাম না। এই বই পড়ে অনেক জ্ঞান অর্জন করেছি, বুজেছি ও জেনেছি। এখন লাইব্রেরিতে অনেক মজার মজার বই পড়ি, এতে আমি আনন্দ পায়।

কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের ছাত্র ফিরোজ হাসান বলেন, একটি শিশু মাঠে খেলতে যায়। খেলার প্রতি আগ্রহ আছে বলেই মাঠে সে খেলতে যায়, তেমনি আমরা যদি নিয়মিত বই পড়ি তাহলে বইয়ের প্রতি আমার আগ্রহ জন্মাবে। ঠিক তেমনি বই পড়ার প্রতি আগ্রহ থেকে আমার বইয়ের প্রতি ভালবাসা জন্মেছে।

তিনি আরো বলেন, আলমডাঙ্গা উপজেলা শহর হলেও যে এখানে একটি সংস্থা আছে যারা এমন একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যেখানে গণ্যমান্য ব্যাক্তিরা নিজেদের অর্থ ব্যায় করে এটা চালিত রেখেছে। শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষ এখানে আসছে।

আলমডাঙ্গা সরকারি কলেজের ছাত্রী স্বর্ণাপাল পূজা বলেন, লাইব্রেরিতে যখনই আসি আনন্দ পাই, সবাই এখানে উম্মুক্ত পরিবেশে পড়াশুনা করে। সাংস্কৃতিক আলোচনা হয় গণ্যমান্য অতিথি আসেন শুক্রবারে।

প্রধান শিক্ষক জামিরুল ইসলাম বলেন, আমরা যখন পাবলিক লাইব্রেরিতে প্রবেশ করি তখন জ্ঞানের সমুদ্রে প্রবেশ করি। যারা এখানকার পাঠক তারা তাদের জন্মদিনে বই উপহার পায়। শুধু জন্মদিনেই নয়, বই পড়ে রিভিউ লিখে বই উপহার পাওয়া যায় এই পাঠাগার থেকে। এটি একটি উন্মুক্ত পাঠাগার। প্রতিদিনই এখানে অনুষ্ঠান থাকে ।

হাই রোডের বাসিন্দা এ কে এম ফারুক বলেন, আমরা আলমডাঙ্গায় যারা অবিভাবক তারা স্বপ্ন দেখি আমাদের সন্তানরা যেন একটা সুন্দর সুষ্ঠু পরিবেশে লেখাপড়ার পাশাপাশি সুষ্ঠু সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে যেন তারা জীবনকে গড়ে তুলতে পারে। এমন একটি উদ্যোগের প্রতিফলন আমরা দেখি। কিছুদিন আগে আলমডাঙ্গায় স্বয়ম্ভর পাবলিক লাইব্রেরি নামে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেময়ে অল্প কিছু ছেলেমেয়েরা সেখানে যাতায়াত করতো। কিন্তু সময়ের পথ পরিক্রমায় আজ এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি স্কুল, হাইস্কুল ও কলেজের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা নিয়মিত পড়াশুনার জন্য সপ্তাহে ১ দিন বাদে প্রতিদিন এখানে আসে। এতে তারা আমাদের উৎসাহ দিতে সাহায্য করে। তাছাড়া লাইব্রেরিতে প্রতিদিন ২টা জাতীয় দৈনিক আসে। সেখান থেকে পড়াশুনার পাশাপাশি তারা জাতীয় ও দেশ বিদেশের খবর সংগ্রহ করে।

তিনি বলেন, আমি অবিভাবক হিসেবে এখানে আসি। প্রতি সপ্তাহে সাপ্তাহিক পাঠচক্রের আয়োজন করে আবার প্রতি মাসে মাসিক পাঠচক্র করে। একটি দুটি বইয়ের ওপর । সবাই সেখানে অংশগ্রহণ করে। সবাই সবার মতামত তুলে ধরে। অন্যরা না পড়া বই সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যায়।

অবিভাবক দিলিপ সরকার বলেন, তারা পাঠচক্রে অংশ নেয়। ছোট ছেলেমেয়েরা যে বই পড়ে তার ওপর কথা বলে আবার যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, তারা যে বই পড়ে তার ওপর কথা বলে। তাদের এই সব শুনতে আমার ভাল লাগে। আমি বিকালের অনুষ্ঠানগুলোতে আসি। তিনি বলেন, এখানে নিয়ম আছে মোবাইলে নক করলে লাইব্রেরির স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে বই বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসে ।

লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা এনামুল হক বলেন, শুধু শিক্ষার্থী নয়, সব শ্রেণি, পেশা ও বয়সের মানুষেরা বই পড়লে তবে সমাজ আলোকিত হবে।

এ লাইব্রেরিতে প্রায় ৬০০ জনের মত পাঠক রয়েছেন। ২৫ জন স্বেচ্ছাসেবেক রয়েছেন।

স্বাআলো/এসএ

.

Author
মফিজুর রহমান জোয়ার্দ্দার, চুয়াডাঙ্গা
জেলা প্রতিনিধি