ঝাঁড়-ফুঁক আর লতাপাতা বেটে চিকিৎসা দেয়া দিন শেষ

কথায় আছে ‘ধর্মের ঢোল আপনিই বাজে’। ঝাড়-ফুকের মত সাবেক আমলের প্রতারণারমূলক চিকিৎসা চালু করেছিল যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের খন্দকার কবির হোসেন। তার এ প্রতারণার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সে মামলা করে। কিন্তু বেশি দিন তার প্রতারণা বিষয়টি চেপে রাখতে পারেনি। ভ্রাম্যমাণ আদালতের হাতে ধরা পড়েছে। তার চিকিৎসার বৈধতার কোনো কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় তাকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে এক লাখ টাকা। সেই সাথে তার তার চিকিৎসালয়টি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সমাজের মানুষের পশ্চাদপদতা ও কুসংস্কারের জালে মানুষকে আবদ্ধ দেখে একটি কবিতা লিখেছিলেন, যার একটি চরণ হলো ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখন বসে. বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি কোরআন হাদিস চষে।’ কবির সময়কাল থেকে বহু বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা সেই অবস্থা থেকে এখনো সরে আসতে পারিনি। শৈশবে শোনা যেত সাপে কাটা রোগী ঝাড়ফুক করে বাঁচান যায়। এমনই একটি কল্পিত কাহিনী নির্ভর ‘জরিনা’ নামে একটি কবিতা ওই সময় এত জনপ্রিয় ছিলো যে ফোল্ডার করা ৮ পৃষ্টার ওই কবিতাটি গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে পাওয়া যেতো। যারাই বাজারঘাটে যেত তারাই একটা কিনে আনতো। যারা পারত তারা সুর করে পড়তো এবং তাকে ঘিরে নারী-পুরুষ মনযোগ সহকারে শুনত সেই কবিতাটি। কবিতার মূল কথা ছিলো বেদের মেয়ে জরিনা ও তার দাদী ঝাড়ফুক করে জমিদারের সাপে কাটা মৃত ছেলেকে বাঁচিয়ে তুলেছিলো। পরে সাপুড়ে জরিনার সাথে জমিদারের ছেলের বিয়েও হয়।

এ সব কল্প কাহিনী আজো সমাজে চালু আছে।

দিন পাল্টেছে। কবি সুফিয়া কামাল বাস্তবতার সাথে মিল করে কবিতা লিখেছেন ‘আমরা যখন আকাশের তলে উড়ায়েছি শুধু ঘুড়ি, তোমরা এখন কলের জাহাজ চালাও গগন জুড়ি।’ এটাই বাস্তবতা। যে সময় আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিলো না তখন মানুষ সান্ত্বনা পেতে অনেক কিছু করতো। কিন্তু এখন সে দিন আর নেই। আগেকার দিন হলে হয়তো কবির আরো কিছু দনি তার ব্যবসা চালিয়ে যেতে পাতো। নিরুপায় মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়তো লোকটির বাড়িতে। এ সুযোগে তার কিছু বাণিজ্যও হতো। জ্ঞান-বিজ্ঞনের উৎকর্ষতার দিনেও যে আজ এক শ্রেণির মানুষ সেই আদি কালের ধ্যান-ধারণা নিয়ে আছে এটাই বিষ্ময়কর। কবি গুরু লিখেছিলেন, ‘হে বঙ্গ জননী, সাত কোটি সন্তানকে রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করোনি।’ আসলে জাতি হিসেবে বাঙালি এক হুজুগে জাতি। নতুবা এক রাতে সারা দেশের মানুষ কঞ্চির পানি খায় কি করে? কে হুজুগ তুলে দিল কঞ্চির পানি খেলে রোগ-ব্যাধি সেরে যাবে। আর অমনি এই পানি খেল সবাই। ভাবতেও অবাক লাগে মুখে মুখে সারা দেশে এ কথাটি ছড়িয়ে পড়েছিল। কেউ একবার ভেবেও দেখল না, আসলে কি কথাটা সত্য।

জাতি হিসেবে আমাদেরকে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হলে কুসংস্কারমুক্ত হতে হবে, হতে হবে বাস্তববাদী। তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়নের যুগে সবাইকে প্রযুক্তিকে আকড়ে ধরতে হবে। মনে রাখতে হবে বিজ্ঞান বাদ দিয়ে কেউ এগোতে পারে না।

.