দারাজের বাটপারি, ঘড়ির বদলে ক্রেতাকে পাঠালো ইট

একটি বহুজাতিক কোম্পানির কর্মকর্তা কাওসার খান শখ করে একটা ঘড়ি অর্ডার করেছিলেন অনলাইনভিত্তিক পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের প্লাটফর্ম দারাজে। এরপর অন ডেলিভারিতে পণ্যটি কয়দিন পর বুঝেও নেন তিনি। কিন্তু প্যাকেট খুলেই হতভম্ব হয়ে পড়েন তিনি। প্যাকেটে প্রায় ২ হাজার টাকার ঘড়ির বদলে দেয়া হয়েছে একটি ইটের টুকরো। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দারাজের কাস্টমার কেয়ারে অভিযোগ করেন। কিন্তু কোনো ফল পাননি। উল্টো দারাজের পক্ষ থেকে বলা হয়, পণ্য খোলার সময় ভিডিও না করার কারণে কোনো ধরনের সহযোগিতা করা যাবে না।

রীতিমতো দিনদুপুরে ডাকাতের খপ্পড়ে পড়ার মতো অবস্থা চট্টগ্রাম নগরীর ইপিজেড এলাকার বাসিন্দা কাওসার খানের। বুধবার (১৫ জুন) ‘দারাজ ডটকম’ এ ঘড়ি অর্ডার করে এভাবেই প্রতারিত হন তিনি।

এর আগেও বিভিন্ন মানুষ দারাজ থেকে পণ্য অর্ডার করে প্রতারিত হয়েছেন। এমনকি মোবাইল অর্ডার করে পেয়েছেন পেঁয়াজ, আবার কেউ দেয়ালঘড়ির বদলে পেয়েছেন শুধুমাত্র ঘড়ির তিনটি কাঁটা। জুতার বদলে স্যান্ডেল, এমনকি স্মার্টফোনের অর্ডারে হুইল সাবান দেয়ার অভিযোগ রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

এছাড়াও প্রদর্শিত পণ্যের বদলে ভিন্ন পণ্য দেয়া বা বাজার মূল্যের থেকে ডিসকাউন্টের পরও বেশি মূল্য রাখার শত শত অভিযোগও রয়েছে দারাজের বিরুদ্ধে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, শুধুমাত্র ২০১৮ সালের জুন থেকে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১৯টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে ১৩ হাজার ৩১৭টি। আর এসবের মধ্যে বেশি অভিযোগ শুধু দারাজের ওপরই। ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত শুধু দারাজের বিরুদ্ধেই অভিযোগ জমা পড়েছে দুই হাজারেরও বেশি। আর এই দুই হাজার মধ্যে শুধু দারাজে অর্ডার দিয়ে পণ্য না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে ১ হাজার ১৯টি।

বেশিরভাগ সময় ভুক্তভোগী ক্রেতারা তাদের জরিমানা পান না দারাজের শর্তাবলির জন্য। ক্রেতারা এসব ই-কমার্স সাইটের শর্তাবলিগুলো পড়েন না। প্রায় শর্তাবলি ইংরেজিতে লেখা হওয়ায় অনেকে বুঝেও না। এর ফলে প্রতারণা শিকার হলেও ওইসব শর্তাবলির কারণে জরিমানা পান না। তাই ই-কমার্স সাইগুলোকে শর্তাবলি বাংলায় লেখার নির্দেশনা দেয়া হয় ভোক্তা অধিকারের পক্ষ থেকে।

এর আগে ২০১৯ সালের ২৯ নভেম্বর দারাজে ২৯৯ টাকায় একটি দেয়ালঘড়ি অর্ডার করেন চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এলাকার সিরাজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। অর্ডারের ২০ দিন পর যখন সিরাজ ঘড়িটি বুঝে নেন তখন তাকে ঘড়ির বদলে দেওয়া হয় ঘড়ির তিনটি কাঁটা। এর পরপরই তিনি দারাজের ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে যোগাযোগ করলে ফিরতি ম্যাসেজে তাকে জানানো হয়, আপনার পণ্যটি আর রিটার্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। অনুগ্রহ করে পণ্য ক্রয়ের পূর্বে মূল্যসহ পণ্যের ছবি, রং, বিস্তারিত বিবরণী এবং রিটার্ন পলিসিটি চেক করুন। দারাজের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।

প্রতারণার বিষয়ে কাওসার খান বলেন, কিছুদিন আগে আমি একটি হাত ঘড়ি অর্ডার (নম্বর-৬২৮৫০১১৯১৫৫২৪০৫) করি। ঘড়িটির দাম ১ হাজার ৮৫০ টাকা হলেও কুরিয়ার ও ভ্যাট চার্জসহ ঘড়িটির দাম পড়ে ১ হাজার ৯২০ টাকা। কিন্তু ঘড়ি হাতে পাওয়ার পর প্যাকেট খুলে দেখলাম একটি ইটের টুকরো।

তিনি বলেন, আমি তাৎক্ষণিক যোগাযোগ করি দারাজের কাস্টমার কেয়ারে। কিন্তু ঘড়িটি আনবক্স করার সময় কেন ভিডিও করে রাখিনি সেজন্য কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না বলে জানায় তারা।

দারাজের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ না পেলে ভোক্তা অধিকারে অভিযোগ দেবেন বলে জানান কাওসার। তিনি বলেন, কেউ কি ভিডিও করে আনবক্স করে? দারাজ যদি নিজেদের ওপর নিজেরাই ভরসা করতে পারতো তাহলে ভিডিও করার প্রশ্ন আসবে কেন? তাহলে নিশ্চয় তারা এমন কাজকর্মগুলো করে। দারাজতো এটা রীতিমতো আমার সঙ্গে বাটপারি করলো।

কাওসার খানের বিষয়ে যোগাযোগ করা হয় দারাজের সঙ্গে। তারা এ ঘটনায় আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করে। কিন্তু এ ব্যাপারে ক্ষতিগ্রস্তকে কোনো ক্ষতিপূরণ দেবে না বলে জানায়।

বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির কথা বলা হলে দারাজের পক্ষ থেকে জানায়, কাওসারের বিষয়টি তাদের কাছে ‘কমপ্লেন’ আকারে জমা পড়েছে। ইতিমধ্যে দারাজের টিম কাওসারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বিষয়টি মীমাংসার জন্য।

কিন্তু দারাজের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের যোগাযোগ ও মীমাংসার কথা বলেনি বলে জানান কাওসার। তিনি বলেন, আমাকে দারাজ কোনো ফোন দেয়নি। তারাতো সেদিন ক্লিয়ার করে বলেই দিলো, ভিডিও না করায় আমি ক্ষতিপূরণ পাবো না।

বর্তমানে দেশে প্রতিদিন অনলাইনভিত্তিক এসব ই-কমার্স সাইটগুলো থেকে কেনাকাটা করেন প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি ক্রেতা। আর এই সুযোগে প্রায়ই ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করে বেশিরভাগ ই-কমার্স সাইট।

তবে প্রতারণা আগের চেয়ে কমে গেছে দাবি করেন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাসিমা আক্তার। তিনি বলেন, কোনো ক্রেতা প্রতারিত হলে তিনি যদি ই-ক্যাবের ফেসবুক গ্রুপে অভিযোগ করেন তাহলে ই-ক্যাবের পক্ষ থেকে ক্রেতা ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে একটা সমাধান করিয়ে দেয়া হয়।

আর কোনো ক্রেতা যদি অনলাইনে অর্ডার করে প্রতারিত হন তবে তাদের পণ্য হাতে পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে অভিযোগ করার পরামর্শ দেন বাংলাদেশ হাইকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রিগ্যান আচার্য। তিনি বলেন, যেহেতু প্রতারণার বিষয়টি ডিজিটালভাবে হয়েছে সেহেতু ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি চাইলে ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও মামলা করতে পারেন। তবে ভোক্তা অধিকারে অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। প্রতারিত ব্যক্তি ভোক্তা অধিকারের করা জরিমানার ২৫ শতাংশ টাকাও ক্ষতিপূরণ হিসেবে পান।

স্বাআলো/এসএ

.

Author
চট্টগ্রাম ব্যুরো