চৌগাছায় অপরিণত বয়সের প্রেমে আত্মহত্যাচেষ্টা: প্রেমিকার পর সেই প্রেমিকের মৃত্যু

ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি টগর ও ভর্তি রেজিষ্টার

যশোরের চৌগাছায় ৯ম শেণিতে পড়ুয়া প্রেমিক টগর হোসেন (১৫) ও প্রেমিকা জান্নাতুল ফেরদৌস মীম (১৪) গত ৮ জুন একসাথে আগাছা নাশক পানে আত্মহত্যা চেষ্টা করে। তিন দিন পর ১০ জুন খুলনা মেডিকেলে প্রেমিকা মিমের মৃত্যু হয়।

প্রেমিকার মৃত্যুর ২০ দিন পর বৃহস্পতিবার (৩০ জুন) দুপুরে প্রেমিক টগর ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থাায় মারা গেছে।

মীম ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার গ্রামের আনোয়ার হোসেনের মেয়ে। সে চৌগাছার জগদীশপুর গ্রামে মামা বাড়ি থেকে জগদীশপুর-মির্জাপুর ইসমাইল হোসেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণিতে লেখাপড়া করতো। প্রেমিক টগর জগদীশপুর গ্রামের আক্তার হোসেনের ছোট ছেলে। সেও একই বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলো।

মীমের মৃত্যুর ঘটনায় গত ১৯ জুন যশোরের আদালতে সে সময়ে ঢাকা মেডিকেল চিকিৎসাধীন প্রেমিক টগর, তার ভাই যশোর পলিটেকনি ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থী সাগর (১৯) এবং মা নাজমা আক্তারের (৩৬) নামে হত্যা মামলা করেন প্রেমিকা মীমের মা পারভীন বেগম। কোমল পনীয়ের সাথে কীটনাশক পান করিয়ে হত্যার অভিযোগ করা হয় মামলায়। যশোরের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সালমান আহমেদ শুভ এ ঘটনায় থানায় পূর্বে কোনো মামলা না হলে অভিযোগটিকে এজাহার হিসেবে গ্রহণ করতে চৌগাছা থানার ওসিকে নির্দেশ দেন।

আদালতে মামলার অভিযোগে মীমের মা বলেন, জগদীপুর মির্জাপুর ইসমাইল হোসেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৯ম শ্রেণিতে পড়ার সময় টগর প্রলোভন দেখিয়ে মীমের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। বিষয়টি টগরের পরিবার জানতে পেরে মীমকে নানাভাবে হুমকি দিতো। এ নিয়ে সালিশে টগরের পরিবার মীমের পিতাকে মারপিট করে। মীম ক্ষোভে টগরের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। এতে টগর অভিমান করে ঘুমের ঔষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। গত ২৫ মে সাগর ও নাজমা মীমদের বাড়িতে এসে তাকে স্কুলে যেতে নিষেধ করে গলিগালাজ ও খুনের হুমকি দেয় মীমকে। এরপর ৮ জুন মীম স্কুলে পরীক্ষা দিতে গেলে আসামিরা সেখানে যেয়ে গলিগালাজ করে। পরে সকাল পৌনে ১০টার দিকে আসামিরা কৌশলে মীমকে ক্লাস রুম থেকে ডেকে কোমল পানির সাথে গন্ধবিহীন কীটনাশক পান করায়। গুরুতর অসুস্থ মীমকে প্রথমে চৌগাছা পরে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে স্বজনেরা। অবস্থার অবনতি হওয়ায় পরে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ জুন দুপুরে মীম মারা যায়। তবে মামলায় একই সাথেই টগরও আত্মহত্যা প্রচেষ্টা করে সেটি এড়িয়ে যান মীমের মা।

এর আগে গত ৮জুন সকালে বিদ্যালয়ে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা শুরুর আগে বিদ্যালয় ভবনের পিছনে গিয়ে একসাথে আগাছা নাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করে মিম (১৪) ও টগর (১৫)। পরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ জুন দুপুরে মারা যায় মিম। একইদিন একই হাসপাতাল থেকে স্থানান্তরপত্র দেয়া হয় টগরকে। পরদিন ১১জুন টগরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে পরিবার। গত শুক্রবার (১৭ জুন) থেকে টগর সেখানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলো। সেখানে বৃহস্পতিবার (৩০ জুন) দুপুরে তার মৃত্যু হয়।

মীম ও টাগর যখন হাসপাতালে ভর্তি ছিলো তখন পুলিশ, মীম ও টগরের পরিবারিক সূত্র এবং স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানিয়েছিলেন, উভয়ের পরিবার প্রেমের সম্পর্ক না মেনে নেওয়ায় একসাথে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় তারা দুইজন। পরে ৮ জুন সকাল ১০ টায় বিদ্যালয়ের মূল ভবনের পিছনে যেয়ে প্রথমে মীম ও পরে টগর আগাছা নাশক পান করে পরীক্ষার হলে যেয়ে পরীক্ষা দিতে শুরু করে। আধাঘন্টা পরীক্ষা দেয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়ে মীম। শিক্ষকরা জানতে চাইলে বলে সে এবং টগর আগাছা নাশক খেয়েছে। তবে টগর সে সময় অস্বীকার করে শিক্ষকদের বলে নিজে খায়নি, শুধুমাত্র মিম খেয়েছে। এরপর সম্পূর্ণ পরীক্ষা দেয় টগর। তখন সবাই ভেবেছিলো টগর আগাছা নাশক খায়নি।

অসুস্থ মীমকে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা উদ্ধার করে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে স্থানাস্তর করে। সেখানে মিমের মা সাংবাদিকদের জানান, তার মেয়েকে বিষ খাইয়ে দিয়ে প্রেমিক টগর পালিয়ে যায়। তখন তিনি টগরের আগাছানাশক খাওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যান। যশোরে মিমের অবস্থার অবনতি হলে ওইদিনই তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানাস্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ জুন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মীমের মৃত্যু হয়।

অন্যদিকে পরীক্ষা শেষে বাড়িতে যেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে টগরের পরিবার তাকে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়। তাকেও প্রথমিক চিকিৎসা দিয়ে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে টগরকেও পরদিন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসার পর ১০ জুন তাকে স্থানান্তরপত্র দেয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরদিন ১১ জুন ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয় তাকে।

খুলনা মেডিকেলে মীমের মৃত্যুর পর খুলনার সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় মৃত্যুর বিষয়ে অবহিত করে তার বাবা আনোয়ার হোসেন একটি লিখিত বয়ান দেন (যেটি এ প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আছে)। সেখানে মীমের পিতা লেখেন মীম (১৪) ৮ জুন সকাল আনুমানিক সাড়ে দশটায় স্কুলে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় ঘরে থাকা ঘাসপোড়া কিটনাশক মোজর (কোমল পনীয়) বোতলে থাকায় মোজো মনে করে খেতে খেতে স্কুলে যায়। পরীক্ষা দেয়ার সময় অসুস্থ হয়ে পড়লে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাকে চৌগাছা হাসপাতালে নেয়। এরপর যশোর হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে ওইদিনই বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে খুলনা মেডিকেলে ভর্তি করি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ জুন ১২.৩০ মিনিটে চিকিৎসক আমার মেয়েকে মৃত ঘোষণা করেন। এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে মর্জি হয়। তখন এ ঘটনায় সোনাডাঙ্গা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়। যার নম্বর ১০২।

অথচ মেয়ের লাশ দাফনের পরই আনোয়ার হোসেন ও তার স্ত্রী চৌগাছা থানায় টগর ও তার মার নামে চৌগাছা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেন। যেটি চৌগাছা থানা পুলিশ তদন্ত করছে। টগর ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি থাকায় এবং তার স্বজনরা সেখানে অবস্থান করায় যে তদন্ত সম্পন্ন হয়নি। এর মধ্যেই মীমের মা আদালতে মামলা করেন এবং সেখানে বলেন চৌগাছা থানা মামলা নেয়নি।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ খবর নিয়ে জানা যায়, মীমের বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করায় এবং তাকে নিয়ে বসবাস করায় তার মা মীমকে নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে নিজের বাবার বাড়ি জগদীশপুর গ্রামে বসবাস করছেন। মীমের বাবা মাদকাসক্ত এবং মীমের পরিবারের কোন খোঁজ নিতেন না বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব কারনে মিমের বড় দুই বোনেরও প্রেমের সম্পর্কের সূত্রে বিয়ে হয়েছে।

চৌগাছা থানার ওসি সাইফুল ইসলাম সবুজ বলেন, অপরিণত বয়সের প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে উভয়েই একসাথে আগাছানাশক পান করে তারা। প্রায় ত্রিশ মিনিট পরীক্ষা দিয়ে মীম অসুস্থ হয়ে পড়ে। টগর সম্পূর্ণ পরীক্ষা দেয়। পরীক্ষার হলে মীম অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেয় শিক্ষকরা। বাড়ি থেকে পরিবারের সদস্যরা হাসপতালে নেয় টগরকে। উভয়কে যশোরে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে উভয়কে খুলনায় স্থানান্তর করা হয়। সেখানে ১০ জুন মিম মারা যায়। আর বৃহস্পতিবার (৩০ জুন) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছে টগর।

স্বাআলো/এসএস

.

Author
আজিজুর রহমান, চৌগাছা (যশোর)
উপজেলা প্রতিনিধি