এবার অধ্যক্ষের নির্দেশে মাথা ন্যাড়া করা হলো মাদরাসা শিক্ষকের

নড়াইলে কলেজের অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরিয়ে অপমান, ঢাকার সাভারে এক কলেজশিক্ষককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ক্ষোভের মধ্যে এবার পটুয়াখালীতে এক মাদরাসা শিক্ষককে অপমান করার ঘটনা ঘটেছে।

সেখানে এই অভিযোগ উঠেছে সেই শিক্ষকের ‍দুই সাবেক সহকর্মীর বিরুদ্ধেই।

পটুয়াখালীর বাউফল পৌর শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডের হাজি সড়ক এলাকায় বাউফল মদিনাতুল উলুম নুরানি হাফিজি ক্যাডেট মাদরাসায় এ ঘটনা ঘটে। মাথা ন্যাড়ার সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পটুয়াখালীর বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন।

ভুক্তভোগী শিক্ষক সম্প্রতি এই মাদরাসাটি ছেড়ে অন্য একটি মাদরাসায় যোগ দিয়েছেন। তার অভিযোগ, তার সাবেক কর্মস্থল মাদরাসার পরিচালক মাওলানা আনিচুর রহমানের নির্দেশে এ ঘটনা ঘটে।

যদিও মারধরের কথা অস্বীকার করে আনিচুর রহমান বলেন, মাথা ন্যাড়া সুন্নতি কাম। তাই ওনাকে লজ্জা দিতে এই কাজ করিয়েছে অন্যরা।

ঘটনার শিকার হাফেজ মনিরুল ইসলাম ভোলা সদর উপজেলার আলীনগর গ্রামের বাসিন্দা।

মনিরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরেই মদিনাতুল উলুম নুরানি হাফিজি ক্যাডেট মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে চাকরি করতেন। একজন ভালো শিক্ষক হিসেবে ছাত্র ও অভিভাবকদের মধ্যে তার সুনাম ছিলো। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ওই শিক্ষকের কাছে পড়াতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।

অভিযোগ ওঠে, এই বিষয়টি ওই মাদ্রাসার পরিচালক আনিচুর রহমানের ভালো লাগেনি। এ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে গত ঈদের আগে চাকরি ছেড়ে চাঁদপুর সদর উপজেলার লাউতলী জামিয়া মদিনাতুল উলুম মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন মনিরুল ইসলাম।

স্থানীয় বাসিন্দা আলী আহম্মেদ জানান, মনিরুল চলে যাওয়ার পর কয়েকজন ছাত্র ওই মাদরাসা ছেড়ে চাঁদপুরের সেই মাদরাসায় গিয়ে ভর্তি হয়। এতে ক্ষুব্ধ হন বাউফল মদিনাতুল উলুম নুরানি হাফিজি ক্যাডেট মাদরাসার পরিচালক মাওলানা আনিচুর রহমান। তার ধারণা, শিক্ষক মনিরুল ইসলাম ওই ছাত্রদের ফুঁসলিয়ে তার মাদরাসায় ভর্তি করেছেন।

এক শিক্ষক জানান, আনিচুর রহমান অভিভাবক পরিচয়ে অন্য একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে মনিরুল ইসলামকে কয়েকজন ছাত্র দেয়ার নাম করে গত ৩ জুলাই বাউফলে ডেকে আনেন। কালিশুরী এলাকার একটি মাদরাসার কক্ষে মনিরুলকে আটকে রেখে মারধর করা হয়।

এরপর আনিচুরের নির্দেশে মাওলানা জসিম উদ্দিন নামে আরেক শিক্ষক মনিরুল ইসলামের মাথা ন্যাড়া করে দেন এবং তার কাছ থেকে একটি মোবাইল ও সাড়ে ৪ হাজার টাকা রেখে রাত ৮টার দিকে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।

বুধবার দুপুরের পর মাথা ন্যাড়ার একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে তোলপাড় হয়। পরে বাউফল থানার ওসি আল মামুনের নির্দেশে এসআই নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশ মদিনাতুল উলুম নুরানি হাফিজি ক্যাডেট মাদরাসায় গিয়ে খোঁজখবর নেন। কিন্তু মাদরাসা বন্ধ থাকায় তারা কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি।

মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করলেও মাথা ন্যাড়া করার কথা স্বীকার করে ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন মাওলানা আনিচুর রহমান। তিনি জানান, আসলে কাজটি ঠিক হয়নি। আমাদের উচিত ছিলো ছেলেধরা বা ছেলে অপহরণের অভিযোগ এনে পুলিশের কাছে পাঠানো। কিন্তু ওই সময় স্থানীয় লোকজন এসে কে কীভাবে মাথা ন্যাড়া করল, আমি নিজেও হতবাক।

তিনি বলেন, যারা মাথা কামিয়েছে তারা বলছে যে মাথা কামিয়ে দিলে অনেকে মনে করবে সুন্নাতি কাম। আর এতে যদি মনিরুল লজ্জা পেয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যায়।

আপনার নির্দেশে মাওলানা জসিম মাথা ন্যাড়া করেছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে আনিচুর বলেন, না, না আমি কাউকে কিছু বলি নাই। তাছাড়া এটার তো ফয়সালা হয়েই গেছে। মনিরুলকে ৫ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। সেও ভুল স্বীকার করেছে। আর আমরাও বুঝেছি যে আমাদেরও কাজটা ঠিক হয়নি।

পটুয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহেদ আহমেদ চৌধুরী জানান, খুবই বাজে কাজ। আমি লোক পাঠিয়েছি। মনিরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ভিডিও ফুটেজ দেখেছি। তারপরও মনিরুল সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলে আরো বিস্তারিত জানাতে পারবো।

স্বাআলো/এসএ

.