ড. ইউনূস প্রধানমন্ত্রী হবেন গুজব ছড়িয়ে ভয় দেখানো হতো গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিকদের

গ্রামীণ টেলিকমের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে শ্রমিকদের পাওনা টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুই শ্রমিক নেতাকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা গুলশান বিভাগ।

গ্রেফতাররা হলেন গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি কামরুজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ মাহমুদ। তবে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ (২৬ কোটি টাকা) আত্মসাতের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ও আগের এমডি জড়িত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া নানা প্রলোভন ও ভয় দেখিয়ে শ্রমিকদের দমিয়ে রাখতে মধ্যস্ততাকারী হিসেবে আইনজীবী ১৬ কোটি টাকা নিয়েছেন বলেও প্রমাণ মিলেছে।

ডিবি জানায়, লভ্যাংশ পাওনা পরিশোধ, অতিরিক্ত অর্থ দেয়ার প্রলোভনের পাশাপাশি গ্রামীণ টেলিকম অফিস ক্যাম্পাসে শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন গুজব ছড়িয়ে দেয় যে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি শ্রীলঙ্কার মতো হবে। ক্ষমতার পটপরিবর্তনে প্রধানমন্ত্রী হবেন গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. ইউনূস। তখন শ্রমিকদের এসব মামলা কোনো কাজে আসবে না, শ্রমিকরা কোনো ক্ষতিপূরণও পাবেন না। বরং তাদের চাকরি হারানো ও জেল খাটাসহ অন্যান্য নির্যাতনের মুখে পড়তে হবে।

এই ভয়ে এবং কিছুই না পাওয়ার অনিশ্চয়তায় আইনজীবীর পরামর্শে একাধিকবার সমঝোতার উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে টেলিকম ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও আইনজীবী বিষয়টি গোপন রাখতে চাপ দেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য জানান গ্রেফতাররা।

বুধবার (৬ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন ঢাকা মহানগর সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ।

তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় গ্রামীণ টেলিকমের বিরুদ্ধে শ্রমিকরা পাওনা আদায় ও দাবি-দাওয়াসহ মোট ১৯০টি মামলা করেন। এসব মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আইনজীবীর মাধ্যমে মোটা অংকের টাকার প্রস্তাব দেয় টেলিকম কর্তৃপক্ষ। একটা পর্যায়ে মামলা তুলে নেবেন, কোম্পানিকে দায়মুক্তি দেবেন, নিজেরা চাকরি থেকে অব্যাহতি নেবেন এবং ইউনিয়ন বিলুপ্ত করবেন এসব কিছুর বিনিময়ে শ্রমিকরা ৪৩৭ কোটি টাকা পাবেন বলে চুক্তি হয় শ্রমিক ও গ্রামীণ টেলিকমের মধ্যে। কিন্তু সেই টাকার বড় একটি অংশ নামে-বেনামে আত্মসাৎ হয়েছে। এই অভিযোগে এক সিবিএ নেতা মিরপুর মডেল থানায় মামলা করেন। সেই মামলা তদন্ত করছে ডিবির গুলশান টিম।

বাদী অভিযোগে উল্লেখ করেন, গ্রামীণ টেলিকম কোম্পানিতে বিভিন্ন সময়ে নিয়োজিত শ্রমিক-কর্মচারীদের স্থায়ীকরণ না করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ক্রমাগত নবায়ন করে। শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী বাৎসরিক লভ্যাংশের ৫ শতাংশ অর্থ ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড (ডব্লিউপিপিএফ), শ্রমিক কল্যাণ ফান্ড এবং শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে (৮০:১০:১০ অনুপাতে) দেয়ার কথা ছিলো। তবে প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারীরা স্থায়ী নয় এবং কোম্পানি অলাভজনক- এ ধরনের কথা বলে শ্রমিকদের আইনানুগ লভ্যাংশ দেয়া হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ঢাকা মহানগর সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ

বিভিন্ন আইনানুগ দাবি-দাওয়ার কারণে ২০২০ সালের ২৫ অক্টোবর একযোগে ৯৯ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করে গ্রামীণ টেলিকম কর্তৃপক্ষ। শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের স্থায়ীকরণ ও লভ্যাংশ পাওনা, বেআইনিভাবে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পরে কোম্পানিতে পুনর্বহাল, আদালতের আদেশ অনুযায়ী পুনর্বহালের পরেও দায়িত্ব না দেওয়ায় আদালত অবমাননা, কোম্পানির অবসায়নসহ অন্যান্য দাবিতে শ্রমিকরা এবং শ্রমিক ইউনিয়ন গ্রামীণ টেলিকমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় মামলা করেন। এ বিষয়ে শ্রম আদালত এবং হাইকোর্টে ১৯০টি মামলা ও রিট পিটিশন দায়ের করেন তারা। তবে তড়িঘড়ি করে অনেকটা গোপনে এসব মামলা উত্তোলন, শ্রমিকদের অর্থ দেয়া এবং প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা লক্ষ্য করা যায়।

ডিবির এ কর্মকর্তা আরো বলেন, গ্রামীণ টেলিকম এবং গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের মধ্যে একটি চুক্তিপত্র সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী গত ১০ মে ঢাকা ব্যাংকের গুলশান শাখায় একটি সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। ২০১০ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর কোম্পানির মোট লভ্যাংশের ৫ শতাংশ হারে এ সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্টে প্রায় ৪৩৭ কোটি টাকা দেওয়া হয়। অ্যাকাউন্টটি থেকে অর্থ উত্তোলনের জন্য গ্রামীণ টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বাধ্যতামূলক দস্তখতকারী (সিগনেটরি) এবং ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে অন্য দুই সিগনেটরি হিসেবে রাখা হয়।

শ্রমিকদের সব পাওনাদি ওই অ্যাকাউন্ট থেকেই পরিচালিত হওয়ার কথা। চুক্তি অনুযায়ী সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে শ্রমিকদের পাওনা এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম কর ছাড়া অন্য কোনো অর্থ ছাড় করার সুযোগ নেই। এরপরও কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং ওই দুই সিবিএ নেতাসহ ইউনিয়নের কিছু নেতার যোগসাজশে ওই অ্যাকাউন্টে থাকা ৪৩৭ কোটি টাকা থেকে গত ১৭ মে এবং ২৫ মে ২৬ কোটি ২২ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়। গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক ইউনিয়নের ডাচ-বাংলা ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে ওই টাকা নিয়ে আসা হয়।

গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক ইউনিয়নের ওই অ্যাকাউন্টের মোট তিনজন সিগনেটরি ছিলেন। তারা হলেন ইউনিয়নের সভাপতি (গ্রেফতার), সাধারণ সম্পাদক (গ্রেফতার) এবং অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ আকতারুজ্জামান (মামলার বাদী)। অন্যান্য শ্রমিকদের মতো টাকা পাওয়ার পরেও শ্রমিকনেতা কামরুজ্জামান, ফিরোজ মাহমুদ ও মাইনুল হাসান ইউনিয়নের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা স্থানান্তর করেন। ডাচ-বাংলা ব্যাংক এবং ব্র্যাক ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে তিন কোটি করে মোট ৯ কোটি টাকা স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করেন তারা।

এছাড়াও ইউনিয়নের নিয়োজিত আইনজীবী অযৌক্তিক ও অতিরঞ্জিতভাবে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ফি/পারিতোষিক নেন।

স্বাআলো/এসএ