করোনা-জ্বর বাড়ছে, দুই ভাইরাসের দাপটে কোণঠাসা মানুষ

দেশে করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের মধ্যে এবার ঘরে ঘরে সর্দিজ্বরে আক্রান্ত রোগী বাড়ছে। করোনা ও ভাইরাস জ্বরের লক্ষণ কাছাকাছি হওয়ায় অনেকেই দ্বিধায় পড়ছেন। তবে উপসর্গ একই ধরনের হলেও নমুনা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নেগেটিভ ফল আসছে। ফলে জ্বরে আক্রান্ত সাধারণ মানুষ শুরুতেই রোগটির ধরন বুঝতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে ভাইরাস দুটির দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন জ্বরে আক্রান্তরা।

চলতি মাসের শুরুতে তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হন কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী। রোগ নিশ্চিত হতে কোভিড-১৯ ও এনএস-১ পরীক্ষায় ফল আসে নেগেটিভ। চিকিৎসকের পরামর্শে টানা এক সপ্তাহ অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের পর তিনি সুস্থ হন। এর পরের সপ্তাহে স্ত্রী ও দেড় বছরের মেয়ে জ্বরে আক্রান্ত হয়। জ্বরের মাত্রা ১০২ থেকে ১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত ছিলো।

চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে টেস্ট করে জানা যায় তাদের টাইফয়েড হয়েছে। ভাই, স্ত্রী ও সন্তানের পর নিজেও জ্বরে পড়েন। এই জ্বর কখনো ১০২ কিংবা ১০৩ ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠে। সঙ্গে ছিরো মুখের মধ্যে তিক্ততা, শরীর ব্যথা, গলা ব্যথা, কাশি ও হালকা শ্বাসকষ্ট। চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানান তার গলায় ইনফেকশন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি মৌসুমে এ রকম নানা কারণে অনেকেই জ্বরে ভুগছেন। এর মধ্যে আছে করোনা, ডেঙ্গু এবং মৌসুমি ফ্লু। জ্বরের কারণে অনেকেরই মুখের রুচি চলে যাচ্ছে এবং তা স্বাভাবিক হতেও অনেক দিন সময় লাগছে।

আইইডিসিআরর উপদেষ্টা ও সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোশতাক হোসেন বলেন- চলতি মৌসুমে করোনা, ডেঙ্গু, মৌসুমি জ্বর এবং শ্বাসতন্ত্রীয় ইনফেকশন এই চার ধরনের জ্বরে মানুষকে বেশি ভোগাচ্ছে। মৌসুমি জ্বর কোভিড বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো ট্রান্সমিশন হচ্ছে। করোনার স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে এমনটা হচ্ছে। করোনা প্রতিরোধের মতো মাস্ক পরলে এটি ছড়াবে না। সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে। ভাইরাস জ্বর হওয়ায় পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে এটি সেরে যায়। ফলে অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়ায়ই ভালো। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খেতে হবে।

তিনি বলেন, এই জ্বর ডেঙ্গু না হলে সেটি শ্বাসতন্ত্র দ্বারা আক্রান্ত ভাইরাস জ্বর বলে ধরে নিতে হবে। রোগীর রেসপিরেটরি চ্যানেল টেস্ট করলে রোগ শনাক্ত সহজ হয়। শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসকে বলে রেসপিরেটরি সিম্পিটিয়াল ভাইরাস। ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো ভাইরাস জ্বরের কারণে শরীর ব্যথা ও মুখের স্বাদ কমে যেতে পারে। এক সপ্তাহ পর রোগী সুস্থ হয়ে যাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন- নরমাল ফ্লু ভাইরাস, কোভিড-১৯ এবং টাইফয়েডের কারণে মানুষ জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। পৃথকভাবে রোগ শনাক্তের জন্য নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ। যেমন-ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে জ্বর হওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যে এনএস-১ পরীক্ষা করতে হবে। টাইফয়েড শনাক্তে জ্বরের সপ্তম দিনে ভিডাল টেস্ট করাতে হবে। কিন্তু অনেকে জ্বর হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে কোভিড, এন্টিজেন বা ডেঙ্গি টেস্ট করাচ্ছেন। তাৎক্ষণিকভাবে সঠিক রোগ শনাক্ত হচ্ছে না। করোনা রোধে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলতে হবে। ডেঙ্গির রোধে বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই মশা নিধন কর্মসূচি বেগবান করতে হবে। টাইফয়েড যেহেতু পানিবাহিত সেক্ষেত্রে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, চলতি ঢেউয়ে করোনার তীব্রতা কম। তবে দীর্ঘমেয়াদি কোনো রোগ যদি শরীরে না থেকে অথবা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো কোনো কারণ না ঘটে থাকে সেটা এক্ষেত্রে ভালো ফল দেবে। আবার ডেঙ্গুর কারণে অনেককে হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে। এছাড়া বন্যাকবলিত এলাকায় পানিবাহিত রোগ বিশেষ করে টাইফয়েড, পেটের অসুখও হচ্ছে। যার কারণে জ্বর হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, করোনার লক্ষণ তিন ধরনের উপসর্গের ওপর নির্ভর করে। সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গগুলোর মধ্যে আছে জ্বর, সর্দি, ক্লান্তি, স্বাদ বা গন্ধ হারানো। কম সাধারণ উপসর্গগুলোর মধ্যে আছে গলা ব্যথা, মাথাব্যথা, ব্যথা এবং যন্ত্রণা, ডায়রিয়া, ত্বকে ফুসকুড়ি, আঙুল বা পায়ের পাতার বিবর্ণতা, চোখ লাল হওয়া বা চোখ জ্বলা। গুরুতর উপসর্গগুলোর মধ্যে আছে নিঃশ্বাস নিতে অসুবিধা হওয়া বা শ্বাসকষ্ট, কথা বলা বা চলাফেরার ইচ্ছা হারানো, বুক ব্যথা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরে সাধারণত তীব্র জ্বর ও সেই সঙ্গে শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। জ্বর ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়। শরীরে, বিশেষ করে হাড়, কোমর, পিঠসহ অস্থিসন্ধি ও মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা হয়।

এ ছাড়া মাথাব্যথা ও চোখের পেছনে ব্যথা হয়। অনেক সময় ব্যথা এত তীব্র হয় যে, মনে হয় হাড় ভেঙে যাচ্ছে। তাই এই জ্বরের আরেক নাম ‘ব্রেক বোন ফিভার’। জ্বর হওয়ার চার বা পাঁচ দিনের সময় শরীরজুড়ে লালচে দানা দেখা যায়। যাকে বলা হয় স্কিন র‌্যাশ, অনেকটা অ্যালার্জি বা ঘামাচির মতো। এর সঙ্গে বমি বমি ভাব এমনকি বমি হতে পারে। রোগী অতিরিক্ত ক্লান্তিবোধ করে এবং রুচি কমে যায়।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভাইরাসজনিত জ্বর একজনের কাছ থেকে অন্যজনের ছড়ায়। যে কারণে এক ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারে। তবে এই জ্বর সাত দিনের মধ্যে খুব বেশি জটিলতা ছাড়াই এমনিতেই ভালো হয়ে যায়।

তিনি আরো বলেন, অনেকেই সাধারণ ফ্লু মনে করে করোনা পরীক্ষা করাচ্ছেন না। মনে রাখতে হবে এখন করোনা চলমান। কারো যদি জ্বর, ঠান্ডা, কাশি লেগে থাকে তাহলে পরীক্ষা করানো উচিত। এতে যিনি আক্রান্ত হচ্ছেন তার থেকে অনেক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করা যাবে। পরীক্ষা না করলে জানা যাবে না তিনি আক্রান্ত কিনা। আক্রান্ত হয়ে থাকলে তার চারপাশে অনেকেই আক্রান্ত হতে পারেন।

স্বাআলো/এস