জ্বালানী তেলের মূল্য সমন্বয় কেনো এবং কতটুকু যৌক্তিক?

জনবান্ধব আওয়ামী লীগ সরকার সব সময় জনগণের স্বস্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। যতদিন সম্ভব ছিলো ততদিন সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির চিন্তা করেনি। ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধের কারণে অবস্থার প্রেক্ষিতে অনেকটা নিরুপায় হয়েই জ্বালানী তেলের মূল্য সমন্বয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। প্রতি মাসে জ্বালানী মূল্য বৃদ্ধি বা সমন্বয় করতে থাকলে অন্যান্য ভোগ্য পণ্য ও পরিবহন সেক্টরে যথেচ্ছ মূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা বেড়ে যায়। একারণেই সরকার অপেক্ষা করেছে বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।

জ্বালানী তেলের আন্তর্জাতিক বাজার এখন কেমন?

বিপিসির ব্রেক ইভেন অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে যদি ডিজেল প্রতি ব্যারেল ৭৪.০৪ মাঃ ডঃ এবং অকটেন প্রতি ব্যারেল ৮৪.৮৪ ডলারে নেমে আসে তবে ডিজেল ও অকটেন প্রতি লিটার যথাক্রমে ৮০.০০ টাকা ও ৮৯.০০ টাকায় অর্থাৎ আগের (৫ আগস্ট ২০২২) মূল্যে বিক্রয় করা সম্ভব হতো যা এখন প্রায় অসম্ভব।

একইভাবে ক্রুড অয়েল এর মূল্য জুন ২২ মাসে ব্যারেল প্রতি ১১৭ মার্কিন ডলার অতিক্রম করে যা এখনো অব্যাহত আছে। অনেকেই ভুলভাবে তথ্যের ব্যবহার করে জনগণকে আরো বিভ্রান্ত করছেন, ক্রুড ওয়েলের দাম কমেছে কিন্তু বাংলাদেশে দাম বেড়ে গেলো কেনো?

অন্যান্য দেশ অনেক আগেই তাদের জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে, আর বাংলাদেশ সরকার ভর্তুকি দিয়ে এসেছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার জন্যও অপেক্ষা করেছে।

ভারত ২২ মে ২০২২ তারিখ থেকে কলকাতায় ডিজেলের মূল্য প্রতি লিটার ৯২.৭৬ রুপি এবং পেট্রোল লিটার প্রতি ১০৬.০৩ রুপি নির্ধারণ করেছে। এই মূল্য বাংলাদেশী টাকায় যথাক্রমে ১১৪.০৯ টাকা এবং ১৩০.৪২ টাকা। (১ রুপি = গড় ১.২৩ টাকা)।

বাংলাদেশে কলকাতার তুলনায় ডিজেলের মূল্য লিটার প্রতি ৩৪.০৯ এবং পেট্টোল লিটার প্রতি ৪৪.৪২ টাকা কমে বিক্রয় হচ্ছিলো।

মূল্য কম থাকায় তেল পাচার হওয়ার আশঙ্কা শতভাগ।

এশিয়ার অনান্য দেশ যেমন – নেপালে ডিজেল ১২৭ টাকা, ইন্দোনেশিয়া ১৩৮, সিঙ্গাপুর ১৮৯ টাকা, চীন ১১৮ টাকা, আরব আমিরাত ১২২.৮০ টাকা ও হংকং এ ২৬০ টাকা। আমেরিকা ইউরোপেও চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে জ্বালানী তেল। যা কোন কোন দেশে ২৫০ টাকারও অনেক উপরে।

জ্বালানি তেল আমদানিতে সর্বশেষ জুলাই ২২ মাসের গড় প্লাটস রেট অনুযায়ীঃ
বিপিসির দৈনিক লোকসানের পরিমাণ
ডিজেলে প্রায় ৭৪,৯৪,৯২,৭০০.০০ টাকা ও
অকটেনে প্রায় ২,৯২,২৩,২১৬.০০
মোট- প্রায় ৭৭,৮৭,১৫,৯১৬.০০ টাকা।

উল্লেখ্য, গত মে/২০২২ ও জুন/২০২২ মাসে লোকসান ছিলো প্রায় শতাধিক কোটি টাকা। এভাবে গত ফেব্রুয়ারি-জুলাই/২০২২ মাস পর্যন্ত বিপিসির প্রকৃত লোকসান/ভর্তুকি দাঁড়ায় ৮০১৪ কোটি টাকার উপরে।
সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ে ডিজেলের মূল্য ১১৪.০০ টাকা করা হলেও জুলাই/২০২২ মাসের গড় হিসেবে প্রতি লিটারে খরচ পড়বে ১২২.১৩ টাকা, অর্থাৎ প্রতি লিটারে তারপরেও ৮.১৩ টাকা লোকসান বিপিসিকে বহন করতে হবে।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা ক্রমাহ্নয়ে হ্রাস পেতে থাকে।

জ্বালানি পণ্যের বিদ্যমান হারে তেল বিক্রয় ও অন্যান্য আয় খাতে গড়ে বিপিসির মাসিক জমা/আয় প্রায় ৫,৫০০.০০ কোটি টাকা। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এলসি পেমেন্টসহ অন্যান্য খাতে বিপিসির ব্যয় বর্তমানে সর্বশেষ জুলাই/২০২২ মাসে গিয়ে দাঁড়ায় ১০,৩১২.৭৬ কোটি টাকা।

বিপিসির জ্বালানি তেলের অর্থায়নের জন্য ২ মাসের আমদানি মূল্যের সমান হিসেবে প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকা চলতি মুলধন হিসেবে সংস্থান রাখা আবশ্যক। বর্তমানে চলতি মুলধন হ্রাস পাওয়ায় মার্চ/২০২২ থেকে অদ্যাবধি উন্নয়ন প্রকল্প ও বিবিধ খাত হতে প্রায় ১১,০০০ কোটি টাকা উত্তোলন করে ভর্তুকিসহ জ্বালানি তেলের মূল্য ও অন্যান্য বিল পরিশোধ করতে হয়েছে।

গত ৩১-০৭-২০২২ তারিখে বিপিসির হিসাবে সামগ্রিকভাবে অর্থ জমা/সংস্থান রয়েছে প্রায় ২২০০০ কোটি টাকা যা দিয়ে আগষ্ট/২০২২ মাসের পর আমদানি ব্যয় অর্থায়ন করা সম্ভব হবে না।

উল্লেখ্য, বিপিসির জন্য জাতীয় বাজেটে কোনো অর্থ সংস্থান রাখা হয়নি। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক পেমেন্ট অবিঘ্নিত রাখার মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন রাখার স্বার্থে মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে বিপিসির আর্থিক অবস্থা স্থিতিশীল রাখা জরুরী।

মার্কিন ডলারের বিনিময় হারের প্রভাব ২০১৬ সালে সরকার যখন জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস করে পুনঃনির্ধারণ করে তখন ডলার ও টাকার বিনিময় হার ছিলো ৭৯.০০ টাকা।

৩ নভেম্বর ২০২১ তারিখ সরকার যখন জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করে তখন ডলার ও টাকার বিনিময় হার ছিলো ৮৫.৮৫ টাকা, যা বর্তমানে ৯৩.৫০ টাকায় উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে ডলার সংকটের কারণে ব্যাংকসমূহ BC রেটে বিপিসির এলসি খুলতে অনিহা প্রকাশ করায় বাংলাদেশ ব্যাংক মার্কেট রেটে ডলার সংগ্রহের নির্দেশনা প্রদান করে। ফলে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণেও জ্বালানি তেল আমদানিতে বিপিসির ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ে পরিবহন সেক্টরে তার প্রভাব- বাসে ভাড়া কতো বৃদ্ধি যৌক্তিক?

দুরপাল্লার বাসের (৫২ সিটের) ক্ষেত্রেঃ

– যাত্রী আসন ৫১ টির অকুপেন্সি ৭০% হিসেবে যাত্রী সংখ্যা ৩৫.০৭ জন ধরে
– বর্তমান ভাড়া যাত্রীপ্রতি= ১.৮০ টাকা/কি.মি
– ডিজেলের মূল্য ৩৪.০০ টাকা বৃদ্ধিতে প্রতি কি.মি এ বাসের খরচ বৃদ্ধি ১০.৪৬ টাকা (প্রতি লিটারে ৩.২৫ কিঃ মিঃ যায় )
– সে হিসেবে প্রতি কি.মি এ যাত্রীভাড়া বৃদ্ধি- ০.২৯২ টাকা
– ডিজেলের মূল্য ৩৪ টাকা বৃদ্ধিতে যাত্রীপ্রতি প্রতি কি.মি এ বাস ভাড়া হবে ১.৮০+০.২৯২ = ২.০৯২ টাকা।
– ডিজেলের মূল্য ৩৪ টাকা বৃদ্ধিতে প্রতি কি.মি এ বাস ভাড়া বৃদ্ধির হার= ১৬.২২%

সিটি এলাকার বাসের (৫২ সিটের) ক্ষেত্রেঃ

– যাত্রী আসন ৫১ টির অকুপেন্সি ৯৫% হিসেবে যাত্রী সংখ্যা ৪৮ জন ধরে
– বর্তমান ভাড়া যাত্রীপ্রতি= ২.১৫ টাকা/কি.মি
– ডিজেলের মূল্য ৩৪.০০ টাকা বৃদ্ধিতে প্রতি কি.মি এ বাসের খরচ বৃদ্ধি – ১৩.৬০ টাকা (প্রতি লিটারে ২.৫০ কিঃ মিঃ যায় )
– সে হিসেবে প্রতি কি.মি এ যাত্রীভাড়া বৃদ্ধি – ০.২৮৩ টাকা
– ডিজেলের মূল্য ৩৪.০০ টাকা বৃদ্ধিতে যাত্রীপ্রতি প্রতি কি.মি এ বাস ভাড়া হবে (২.১৫+০.২৮৩) = ২.৪৩ টাকা।
– ডিজেলের মূল্য ৩৪ টাকা বৃদ্ধিতে প্রতি কি.মি এ বাস ভাড়া বৃদ্ধির হার= ১৩.১৬%

যাত্রী লঞ্চ-এর ক্ষেত্রেঃ

– যাত্রীবাহী লঞ্চের বর্তমান ভাড়া=২.১৯ টাকা/প্রতি কি. মি (ডিজেলের মূল্য=৮০ টাকা/লিটার হিসেবে)
– পরিচালন ব্যয়ের ৪৫% হলো জ্বালানি ব্যয় (BIWTA কর্তৃক পূর্ব নির্ধারিত)
– ডিজেলের মূল্য ৩৪.০০ টাকা বৃদ্ধিতে প্রতি কি.মি এ লঞ্চের জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি-৪২% (৩৪/৮০x১০০=৪২%)
– বর্তমানে যাত্রী ভাড়ার প্রেক্ষিতে পরিচালন ব্যয়ের বিভাজন অনুযায়ী জ্বালানি খরচ বাড়বে – ২.১৯ টাকার ৪৫% হিসেবে=০.৯৯ টাকা
– ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে প্রতি কিঃ মিঃ যাত্রী ভাড়া বৃদ্ধির পরিমান- ০.৪১৫৮ বা ০. ৪২ টাকা (০.৯৯ – এর ৪২%)
– ডিজেলের মূল্য ৩৪.০০ টাকা বৃদ্ধিতেy লঞ্চের ভাড়া হবে (২.১৯ + ০.৪২)= ২.৬২ টাকা
– ডিজেলের মূল্য ৩৪ টাকা বৃদ্ধিতে প্রতি কি.মি এ লঞ্চে ভাড়া বৃদ্ধির হার= ১৯.১৮%

২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য কমিয়ে দিয়েছিলো।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সে অনুযায়ী জ্বালানি তেলের মূল্য রি-এডজাস্টমেন্ট করবে সরকার।

স্বাআলো/এসএ

.