কপোতাক্ষের জলে ভাসছে গ্রামের পর গ্রাম

সিমা রানির রান্নাঘর পানির তলায়। উঁচু করে চুলো বানিয়ে সারছেন রান্নার কাজ। অতিকষ্টে রান্না করতে পারেন মাত্র একবেলা। ঘরের সামনে পানির কল ডুবে আছে।

নদীতে ভাটার পানি কিছুটা কমে গেলে কলের পানিতেই সারতে হয় গোসলসহ অন্যান্য কাজ। ঘরের ভেতরে খাটের ওপরে রেখেছেন আরেকটি খাট। তার ওপরে কোনো মতে রাত পার করছেন। সারাদিন কাটছে পানিতেই, শুধু ঘুমানোর সময়টুকু শুকনোয়। খাট থেকে নামার পর থেকে সবখানেই পানি আর পানি।

এ চিত্র খুলনার কয়রা উপজেলার সর্ব দক্ষিণের জনপদ দক্ষিণ বেদকাশীর চরামুখা গ্রামের। গত ১৩ আগস্ট কপোতাক্ষ নদের অস্বাভাবিক জোয়ারে গ্রামটির রিংবাঁধ ভেঙে যায়। সেই থেকে টানা চার দিন স্থানীয় জনসাধারণ স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ সংষ্কারের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নটির ১০টি গ্রাম তলিয়ে আছে পানিতে। মৎস্য ঘের, ধানের বীজতলা, স্থানীয় বাজার, বাড়িঘর, স্কুল, ইট বিছানো রাস্তা সবকিছু পানির তলায়। দিনে দুই বার জোয়ারের পানিতে ভাসছে জনপদটি।

কোমর সমান পানির ভেতর দিয়ে কিছুদূর এগিয়ে গেলেই দেখা যায় বিনাপানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের সামনের সড়কে পানি কিছুটা কম থাকলেও মাঠে অনেক পানি। বিদ্যালয়ের দোতলা ভবনটিতে কয়েকটি পরিবারের ঠাঁই নিয়েছে রিংবাঁধ ভাঙনের রাত থেকে।

এদের মধ্যে দোতলায় আশ্রয় নেয়া মাসুদ হোসেন- জানান আরো কিছু মানুষ ছিলো, অনেকে চলে গেছে। কিন্তু তার পরিবারের যাওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় তারা এখানেই রয়ে গেছে।

মাসুদ হোসেন বলেন, শক্ত বাঁধের দাবিতে এতো কান্নাকাটি করি। কেউ ফিরেও তাকায় না। শুনেছি টেকসই বাঁধের বরাদ্দ হয়েছে! তা আর কবে হবে? এবার তো সব শেষ হয়ে গেলো। আবার নতুন করে ঘর তৈরি করা লাগবে।

দক্ষিণ বেদকাশীর চরামুখা এলাকার কপোতাক্ষের রিং বাঁধ যেখানে ধসে গেছে, সেখানে যেয়ে দেখা হলো ওই এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য মাসুদ রানার সঙ্গে। তিনি জানান, কপোতাক্ষের নদের তীর ধরে যে রিং বাঁধ, তাকে এখন আর বাঁধ বলার চেয়ে আইল বলাই ভালো। এতোটাই সরু এবং ভঙ্গুর যে সামান্য ঢেউ লাগলেই পানি চলে যায় ভেতরে। আর এ স্থান দিয়ে লোকালয়ের ভেতরে পানি প্রবেশের আর প্রয়োজন নেই। কেনোনা, কপোতাক্ষের বুকে যেভাবে ঢেউ বয়ে চলেছে, ভেতরের অংশেও একইভাবে ঢেউ বইছে। ঘরবাড়ি, উঠোন, ফসলি মাঠ, চিংড়ির ঘের, পানির কল, পুকুর, খেলার মাঠ- সবই ডুবে আছে।

দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান আছের আলী জানান, গত ১৭ জুলাই রবিবার ভোররাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৪/১ প্লোডারের দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের চরামুখা খালের গোড়া এলাকার বেড়িবাঁধের প্রায় ৩০০ মিটার ভাটার টানে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। স্বেচ্ছাশ্রমে পরের দিন তিন হাজার মানুষ রিংবাঁধ দিয়ে পানি আটকাতে সক্ষম হন। কিন্তু এক মাস অতিবাহিত হলেও ওই স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ড কোনো কাজ না করায় গত ১৩ আগস্ট অতিরিক্ত জোয়ারের প্রভাবে পুনরায় রিংবাঁধ ভেঙে কপোতাক্ষ নদের লোনা পানি ডুবে গেছে দক্ষিণ বেদকাশী, চরামুখা, হলুদবুনিয়া, বিনাপানি, পদ্মপুকুরসহ ১০টির বেশি গ্রামে। প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে আছে টানা ৪ দিন। বুধবার সকালে আবারো সবাইকে নিয়ে বাঁধ মেরামতের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আশাকরি আগামী দিন আমরা বাঁধ নির্মাণে সফল হব।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিমেষ বিশ্বাস জানান, পানিতে ডুবে যাওয়ায় দক্ষিণ বেদকাশীর মানুষ খুবই বিপদের মধ্যে আছে। ইউনিয়নটির বেশির ভাগ সড়ক ও বাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ মেরামত করার জন্য পাউবো কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছে।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শাহনেওয়াজ তালুকদার বলেন, প্রথম বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর রিংবাঁধ দেয়া হয়। কিন্তু সেটি মজবুত করা যায়নি। সেখানে জাইকার অর্থায়নে পূর্বের একটি কাজ চলোমান থাকায় আর একটা নতুন প্রকল্প শুরু করতে একটু সময় লেগেছে তার ভিতর নদীতে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়ে রিংবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। জোয়ার-ভাটার কারণে বেশি সময় কাজ করা যায় না। এ কারণেই মূলত বাঁধটি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আপাতত পানি প্রবেশ বন্ধ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এরপর রিং বাঁধ মজবুতের চেষ্টা করা হবে।

স্বাআলো/এস

.

Author
খুলনা ব্যুরো