চৌগাছায় কৃত্রিম সার সংকট তৈরি করছেন ডিলাররা!

যশোরের চৌগাছায় ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সাব-ডিলারদের অভিযোগ বিসিআইসি সার ডিলাররা তাদের সার দিচ্ছেন না। ফলে বাজারে ইউরিয়া এবং এমওপি সারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। একইসাথে টিএসপি ও ডিএপি সারও কেজিতে ৮ থেকে ১০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

কৃষকদের অভিযোগ, সরকার সম্প্রতি ইউরিয়া সারের দাম বাড়িয়ে খুচরা প্রতি কেজি ২২ টাকা করেছে। অথচ বিক্রেতাদের কাছে কিনতে গেলে তারা ২৫ টাকার নিচে সার দিচ্ছেন না। একইভাবে এমওপি (পটাশ) সার বাজারেই পাওয়া যাচ্ছে না। যা পাওয়া যাচ্ছে তা ১৫ টাকা কেজি বিক্রির কথা থাকলেও তারা ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

কয়েকজন কৃষক বলেন, ইউরিয়া সার ২৮ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরেও কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। এছাড়া ২২ টাকা কেজির দেশি টিএসপি ২৯ থেকে ৩২ টাকা, মিশর ও তিউনেশিয়ান টিএসপি ৩৫ থেকে ৩৮ টাকা পর্যন্ত কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, বিসিআইসি সার ডিলাররা তাদের বরাদ্দ দেয়া টিএসপি সার চট্রগ্রাম এবং নওয়াপাড়া থেকে নিজেদের গুদামেই না এনে কাগজপত্র (জিও) বিক্রি করে দেন। পরে মিশর ও তিউনেশিয়ান টিএসপি এনে বেশি দামে কিনতে কৃষকদের বাধ্য করেন।

সাব-ডিলারদের (খুচরা বিক্রেতা) অভিযোগ উপজেলায় মোট ১৬ জন বিসিআইসি সার ডিলার রয়েছেন। এদের বেশিরভাগেরই খুচরা বিক্রির শো-রুম নেই। ফলে তারা অন্য কয়েকজন ডিলারের কাছে সারের কাগজপত্র (জিও) বিক্রি করে দেন। আর সেই কয়েকজন এই সার উপজেলার নিবন্ধনধারী সাব-ডিলারদের (খুচরা বিক্রেতা) কাছে বিক্রি না করে উপজেলার বাইরে চোরাইভাবে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ফলে পুরো উপজেলা জুড়ে ইউরিয়া এবং এমওপি সারের তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ উপজেলায় সরকার বিরোধী রাজনীতির সাথে জড়িত কয়েকজন ডিলার সরাসরি এই কৃত্রিম সার সংকট তৈরি করছেন।

চৌগাছা পৌরসভার তানভীর এন্টার প্রাইজের স্বত্বাধিকারী আমিরুল ইসলাম বলেন, পৌরসভায় দুইজন বিসিআইসি সার ডিলার রয়েছেন। তাদের একজন উপজেলার অন্য ৫ থেকে ৬ জন ডিলারের সার কিনে নিয়ে নিজে গুদামজাত করে রেখেছেন। নিজের বাড়িসহ বিভিন্ন গুদামে তার অতিরিক্ত সার থাকলেও তিনি আমাদের (সাব-ডিলারদের) কাছে সার বিক্রি করছেন না।

তিনি বলেন, আমরা পৌরসভা এলাকায় ৯ জন (সাব-ডিলার) খুচরা বিক্রেতা রয়েছি। তাদের কাছে সার বিক্রি না করে এই দুই ডিলার কালোবাজারে যারা ডিলার নয় তাদের দিয়ে উচ্চমূল্যে কৃষককে সার ক্রয়ে বাধ্য করছেন।

তিনি আরো বলেন, গতদিন (মঙ্গলবার) আমার সামনের একটি দোকানে বেশি দামে ১০০ বস্তা ইউরিয়া সার বিক্রি করেন পৌরসভার সার ডিলার ও পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম চঞ্চল। আমি তার কাছে মাত্র ২০ বস্তা সার কিনতে চাইলেও তিনি আমাকে সার দেননি। বলেন, সার নেই। দিতে পারবোনা। পরে স্থানীয় এক সাংবাদিকের মাধ্যমে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে ফোন করার পর ওই ডিলার আমাকে মাত্র ১০ বস্তা ইউরিয়া দেন। তার প্রশ্ন কৃষক কেন ২৮ টাকা কেজি ইউরিয়া কিনবেন? উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কি করেন? তিনি মাসোহারা নিয়ে ডিলারদের এই অবৈধ কালোবাজারিতে সহায়তা করছেন।

তিনি বলেন, আমি সাব-ডিলার হওয়া স্বত্বেও আমাকে সার না দিয়ে ডিলার চঞ্চল সাহেব শিমুল নামে এক দোকানিকে দিয়ে উচ্চমূল্যে সার বিক্রি করাচ্ছেন (যিনি সাব-ডিলার নন)। বিষয়টি আমি মোবাইল ফোনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানিয়েছি।

প্রায় একই অভিযোগ করে পৌরসভার অন্য দুই খুচরা বিক্রেতা (সাব-ডিলার) দিপু এন্টার প্রাইজের স্বত্বাধিকারী দিপু হোসেন এবং টিপু এন্টার প্রাইজের টিপু বলেন, ডিলাররা আমাদের সার দিচ্ছেন না। কৃষি কর্মকর্তা আমাদের সার পাবার ব্যবস্থা না করে উল্টো আমাদেরই জরিমানা করছেন। তাদের অভিযোগ, কৃষি কর্মকর্তা অবৈধ সুবিধা নিয়ে ডিলারদের পক্ষাবলম্বন করছেন। যেসব ছোট ছোট দোকান থেকে তিনি সুবিধা পান না সেসব দোকানেই ম্যাজিষ্ট্রেট নিয়ে যেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত করে জরিমানা করছেন।

এ বিষয়ে পৌরসভার বিসিআইসি সার ডিলার ও পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী আব্দুল হালিম চঞ্চল বলেন, তিনি আমার কাছে সার চেয়েছিলেন। আমি তাকে বলেছিলাম ড্যাপ (ডিএপি) ও ইউরিয়া একসাথে নিয়েন। তার সার লাগলে দেবো।

অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, আমরা সারের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রতিদিনই অভিযান চালাচ্ছি। ইতোমধ্যেই কিছু দোকানে জরিমানা করা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইরুফা সুলতানা বলেন, মৌখিকভাবে এমন অভিযোগ পেয়েছি। এরআগেই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত করে কয়েকটি দোকান মালিককে জরিমানাও করা হয়েছে।

ডিলাররা সাব-ডিলারদের সার দিচ্ছেন না এটিও তাকে একজন সাব-ডিলার মোবাইলে জানিয়েছেন বলে তিনি বলেন, সার না পাওয়ার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাউকেই সরকার নির্ধারিত মূল্যের বেশি মূল্যে সার বিক্রি করতে দেয়া হবে না।

স্বাআলো/এসএ

.

Author
আজিজুর রহমান, চৌগাছা (যশোর)
উপজেলা প্রতিনিধি