দ্রুত বড়লোক হতে ৫ শতাধিক বাইক চুরি, অবশেষে খেলো ধরা

রাজধানীর জুরাইন এলাকায় কাঠের দোকানে নকশার কাজ করতেন নূর মোহাম্মদ। একদিন হাসনাবাদ এলাকার চায়ের দোকানে পরিচয় হয় রবিনের সঙ্গে। এরপর দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কীভাবে দ্রুত বড়লোক হওয়ায় এই বুদ্ধি খেলে দুইজনের মাথায়। নূর মোহাম্মদ রবিনকে জানান তার কাছে করাত ধার দেয়ার রেদ আছে। খুব সহজে সেটি দিয়ে মাস্টার চাবি বানানো যায়। যেই পরিকল্পনা সেই কাজ। দেরি না করে রবিনের জিক্সার মোটরসাইকেলের চাবি মতো একটি মাস্টার চাবি বানান তারা। সেই চাবি দিয়ে কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকার সারিঘাটে পার্ক একটি মোটরসাইকেল চুরির পরীক্ষা চালায়। তাতে তারা সফলও হয়। সেই থেকে চুরি শুরু।

২০১৫ সাল থেকে এভাবে বাইক চুরি করে আসছিলো তারা। এখন পর্যন্ত ৫০০টিরও বেশি মোটরসাইকেল চুরি করেছেন তারা। পরে সেগুলো ৪০ থেকে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিতেন। বাইক চুরি চক্রের পাঁচ সদস্য পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলে জিজ্ঞাসাবাদে তারা এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন।

বুধবার (১৭ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে গ্রেফতার সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে সংবাদ সম্মেলন ডাকে ডিবি পুলিশ। তখন এসব তথ্য দেন ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও ডিবির প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ।

এর আগে মঙ্গলবার রাতে নূর মোহাম্মদ ও রবিনসহ এই মোটরসাইকেল চুরি চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তারা হলেন, নূর মোহাম্মদ (২৬), রবিন (২৩), সজল (১৮), মনির (২২) ও আকাশ (২২)। তাদের কাছ থেকে ১৩টি চোরাই মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

হারুন অর রশীদ জানান, ডিবির টিমটি ওয়ারী এবং গেন্ডারিয়া থানার দুটি চুরি মামলা তদন্ত শুরু করে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করতে গিয়ে তাদের সন্ধান মেলে। গ্রেফতারকৃত চোর চক্রটি ঢাকা মহানগর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মোটরসাইকেল চুরি করে আসছিলো। তাদের মূলহোতা নূর মোহাম্মদ জুরাইন এলাকায় একটি কাঠের দোকানে নকশার কাজ করতো। পূর্বে তার বাসা ছিলো কেরানীগঞ্জ। একদিন হাসনাবাদ গলির ভেতর চা দোকানে রবিনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। দুইজন মিলে পরিকল্পনা করে, কিভাবে অল্প সময়ে বড়লোক হওয়া যায়। নূর মোহাম্মদ রবিনকে বলে, তার কাছে করাত ধার দেয়ার রেদ আছে যা দিয়ে মোটরসাইকেলের চাবি পাতলা করে ‘মাস্টার কি’ বানানো যাবে। পরিকল্পনা মোতাবেক রবিনের জিক্সার মোটরসাইকেলের চাবি রেদ দিয়ে ঘষে পাতলা করে শাড়িঘাট, হাসনাবাদ, দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জে পার্ক করা একটি জিক্সার মোটরসাইকেল চুরি করার উদ্দেশ্যে প্রথমে পরীক্ষামূলক চেষ্টা করে এবং মোটরসাইকেলটি স্টার্ট হলে তারা মোটরসাইকেলটি চুরি করে নিয়ে যায়।

এরপর থেকে এই চাবিকেই ‘মাস্টার কি’ হিসেবে ব্যবহার করে দুই বন্ধু দীর্ঘদিন ধরে মোটরসাইকেল চুরি করে আসছিলো। নুর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ৪টি মামলা, রবিনের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা এবং অন্যান্য তিনজনের বিরুদ্ধে একটি করে মামলা আছে।

চোর চক্রের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, চোরাই মোটরসাইকেল বিক্রি করার জন্য তারা দোহারে সজলকে তাদের চক্রের সদস্য হিসেবে যুক্ত করে। ঢাকা মহানগর এলাকা থেকে মোটরসাইকেল চুরি করে নিরাপদ রোড হিসেবে পোস্তগোলা ব্রিজ পার হয়ে মাওয়া রোডের শ্রীনগর বাইপাস হয়ে মেঘুলা বাজার, দোহার রুট হিসেবে ব্যবহার করে। অন্যদিকে বাবুবাজার ব্রিজ পার হয়ে কেরাণীগঞ্জ, জয়পাড়া ও দোহার এলাকা যাওয়ার রুট হিসেবে ব্যবহার করে। সজল ও মনির দোহারের বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষের চোরাই মোটরসাইকেল ইন্ডিয়ান বর্ডার ক্রস গাড়ি বলে বিক্রি করে আসছিলো।

গ্রেফতার সজল জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, সে নিজেও বড়লোক হওয়ার নেশায় দোহারের মেঘুলা বাজারের একজন ধনী বেকারি ব্যবসায়ীর মেয়েকে পালিয়ে নিয়ে বিয়ে করে। কিন্তু মেয়ের মা-বাবা তাদের মেয়ের সঙ্গে সজলের সম্পর্ক ছিন্ন করলে সজল হতাশ হয়ে বড়লোক হওয়ার নেশায় আসামি নুর মোহাম্মদ ও রবিনদের চক্রে যোগ দেয়।

গ্রেফতারকৃত সজল, মনির ও আকাশদের মূল কাজ ছিল দোহার ও আশেপাশের এলাকা থেকে চোরাই মোটরসাইকেল বিক্রির জন্য ক্রেতা খুঁজে বের করা। প্রতিটি চোরাই মোটরসাইকেল তারা ৪০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করতো। বিক্রির টাকা নূর মোহাম্মদ ৪০ শতাংশ, রবিন ৩০ শতাংশ ও অবশিষ্ট টাকা অন্যান্যরা নিতো।

সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির গোয়েন্দা ওয়ারী বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার তরিকুর রহমান ও ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের ডিসি ফারুক হোসেনসহ ডিবির ওয়ারী বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

স্বাআলো/এসএ

.

Author
ঢাকা অফিস