এক রোগ সারাতে এসে আরেক রোগ বাঁধিয়ে হাসপাতাল ছাড়ছে রোগীরা!

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই রোগীকে বিদায় কার হচ্ছে ছাড়পত্র দিয়ে। এতে সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়ায় রোগীকে দীর্ঘদিন কষ্ট পেতে হচ্ছে রোগ নিয়ে। আবার অনেক রোগীর অন্য কোনো রোগ ধরা পড়লে তাকে রেফার্ড না করেই দিয়ে দেয়া হচ্ছে ছাড়পত্র। চোখের দেখায় রোগীকে কিছুটা ভালো মনে হলেই প্রেসক্রিপশনে ওষুধ ও নির্দেশনা লিখে দিয়ে ছাড়পত্র দেয়া হয়। এভাবে এক অসুখ সারতে এসে আরেক অসুখ নিয়ে হাসপাতাল ছাড়তে হচ্ছে অনেক রোগীকে। বিশেষ করে হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগেই এমনটা বেশি হচ্ছে বলে জানা গেছে।

তবে হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা বিষয়টি স্বীকার করলেও আসনের তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় এভাবে ছাড়পত্র দেয়া হয় বলে জানান। একইসঙ্গে ধারণ ক্ষমতার দুই-তিন গুণ বেশি রোগী থাকলে চিকিৎসা দিতেও হিমশিম খেতে হয়।

হাসপাতালের ২৬ নম্বর অর্থোপেডিক্স ওয়ার্ড থেকে রবিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ছাড়পত্র পান চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাসিন্দা মোহাম্মদ পেয়ারু। বাড়ির পাশে গাছের ডাল কাটতে গিয়ে পড়ে পা ভাঙেন তিনি। গত ৯ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হন। তার পায়ে এই কয়েকদিনে দুই বার অপারেশন হয়েছে। কিন্তু ডায়াবেটিকস থাকায় সেলাই শুকোয়নি। এছাড়া গাছ থেকে পড়ে তিনি বুকেও ব্যথা পেয়েছেন। তার ইসিজি, ইকো করিয়ে হার্টের সমস্যা দেখা গেছে। কিন্তু তাকে হৃদরোগ বিভাগে রেফার্ড না করেই ছাড়পত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়।

পেয়ারু বলেন, ওয়ার্ড থেকে এক ডাক্তার বলেছিলেন, হার্টের ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে সিসিইউ বা হৃদরোগ বিভাগে রেফার্ড করবেন। এদিকে পায়ের অপারেশনের জায়গা থেকে পুঁজ বের হচ্ছে। এ অবস্থাতেই ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।

পেয়ারু সঙ্গে থাকা তার ছোট ভাই বলেন, এ কয়েকদিনে প্রায় ২২ হাজার টাকার মত খরচ হয়েছে। এখন এ অবস্থায় আমার ভাইকে নিয়ে কোথায় যাবো?

শুধু পেয়ারু নন, রবিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) শুধুমাত্র ২৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ১৭ জন রোগীকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। সকালে কয়েকজন অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক পদমর্যাদার ডাক্তার রাউন্ড ডিউটিতে রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। শারীরিক অবস্থা ভালো মনে হলেই সহকারী রেজিস্ট্রারকে জানিয়ে দেন ছাড়পত্র দিতে। তারপর ওয়ার্ডের ইন্টার্ন ডাক্তার অথবা ইনডোর মেডিকেল অফিসার (আইএমও) রোগীকে ওষুধ এবং নির্দেশনা লিখে ছাড়পত্র দেন।

জানা গেছে, গত কয়েকদিনের যেসব রোগীকে ছাড়পত্র দেয়া গেছে তারা কেউই পুরোপুরি সুস্থ নন। এদের মধ্যে আবার অনেকে অন্য রোগও পাওয়া গেছে। তাদের সম্পূর্ণ চিকিৎসা না দিয়ে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে।

এমনই এক রোগী আবু সাদ্দামকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে ১৪ নম্বর ওয়ার্ড থেকে। তিনি প্যারা টাইফয়েডে আক্রান্ত। কিন্তু তাকে যে ইনজেকশন দেয়া হচ্ছে তার নির্দিষ্ট সময় শেষ হয়নি। তিনি বলেন, ডাক্তার রবিবার বলেছেন, ইনজেকশন বাড়িতে গিয়েও দিতে পারবো। ওষুধ লিখে দিয়েছেন। সেগুলো কিনে বাড়িতে গিয়ে খেতে বলেছেন।

আরো জানা গেছে, সাধারণত জ্বর, টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুসহ নানা সমস্যায় রোগী ১৩, ১৪, ১৬ নম্বর মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হন। কিন্তু এ ওয়ার্ডে অনেক রোগীর পরবর্তীতে কিডনির সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু এসব রোগীকে কিডনি বিভাগে রেফার না করে ছাড়পত্র দিয়ে দেয়া হয়। তাদের পরে হাসপাতালের কিডনি বহির্বিভাগে এসে ডাক্তার দেখানোর পরামর্শও দেয়া হয়।

ঠিক এমনটাই ঘটেছে আগ্রাবাদ মুহুরীপাড়ার সিএনজি ড্রাইভার মুনিরের সঙ্গে। প্রথমে তিনি ডায়রিয়া আক্রান্ত হন, সঙ্গে ছিলো জ্বর ও বমি। ভর্তি হন ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে। কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তার কিডনির সমস্যা পাওয়া যায়। পরে ডায়রিয়া কমার চারদিনের মাথায় তাকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। এরপর ওয়ার্ড থেকে বলা হয়, কয়েকদিন পর কিডনি বহির্বিভাগে দেখাতে।

তবে হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে দেখা গেছে আরও করুণ চিত্র। রবিবার এই ওয়ার্ডে থেকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে ২৫ জনকে। যাদের অনেকেই হার্ট ফেইলর রোগী, যাদের শ্বাসকষ্ট রয়েছে।

এমন একজন নাছিমা আক্তার। বাড়ি হালিশহরের বড়পুলে। তার বুকে মাঝে মাঝে ব্যথা হতো। একদিন অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি। তারপর তাকে মেডিকেলের সিসিইউ বহির্বিভাগে দেখিয়ে ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হয়। কয়েকদিন থাকার পর বুকের ব্যথা কমলেও শ্বাসকষ্ট ছিলো। এ অবস্থায় রবিবার তাকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। নাছিমাকে যখন ওয়ার্ড থেকে লিফটে নেয়া হচ্ছিলো তখনও তার শ্বাসকষ্ট ছিলো।

একই চিত্র ২৮ নম্বর নিউরোসার্জারি ওয়ার্ডে। এখানে স্ট্রোক, ব্রেইন টিউমারসহ নানা জটিলতায় রোগী ভর্তি করানো হয়। কিন্তু রোগীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, চিকিৎসা শেষ হওয়ার আগেই ছাড়পত্র দেওয়া হয়।

তবে নিউরোসার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. নোমান খালেদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, রোগী সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমরা ছাড়পত্র দিই না। তবে রোগী স্বেচ্ছায় চলে গেলে আমরা বাধা দিই না।

চট্টগ্রাম মেডিকেলের হৃদরোগ বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ডা. প্রবীর কুমার দাশ বলেন, আসলে রোগী সুস্থ হওয়ার আগে ছাড়পত্র দেয়াটা হৃদরোগ বিভাগে বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু উপায় থাকে না। ওই বিভাগের মেঝেতে থাকে ১০০’শর বেশি রোগী। পুরোনো রোগীকে ছাড়পত্র দিয়ে নতুন রোগীর দিকে ডাক্তার মনোযোগী হন। আসলে ভিড় সামলাতেই এটি করা হয়।

তবে তিনি বলেন, হৃদরোগ একটা স্ট্যান্ডার্ড মেজারমেন্টে না আসলে ছাড়পত্র দেয়া, তা রোগীর জন্য ক্ষতিই হয়। চিকিৎসা নিতে এসে তাকে পড়তে হয় আরেক বিপদে।

স্বাআলো/এসএ

.

Author
চট্টগ্রাম ব্যুরো