সরকারের সব লেনদেন ‘নগদের’ মাধ্যমে পরিচালনার পরামর্শ সংসদীয় কমিটির

মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস সংক্রান্ত সরকারের সব লেনদেন ‘নগদের’ মাধ্যমে পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছে সংসদীয় কমিটি। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ডাক বিভাগের এই ডিজিটাল সেবাটিকে আরো জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে কমিটি।

রবিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এ পরামর্শ দেওয়া হয়। বৈঠকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উপস্থাপিত প্রতিবেদনে ‘নগদ’ এর সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কতিপয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ডাক বিভাগের সহায়তায় পরিচালিত নগদ সম্পর্কে বিরূপ তথ্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।

সংসদীয় কমিটির সদস্যরা নগদের কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করেন বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে। তারা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসটিকে আরো জনপ্রিয় করে গ্রাহকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার পরামর্শ দেন। কমিটির সদস্যরা বয়স্ক ভাতা, শিক্ষা বৃত্তি ও উপবৃত্তিসহ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সব ধরনের ভাতা নগদের মাধ্যমে প্রদানের পরামর্শ দিয়েছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, রাষ্ট্রের উন্নয়নের কথা বিবেচনায় রেখে দেশের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে নগদের মাধ্যমে সরকারের সব লেনদেন পরিচালনার পাশাপাশি জনগণের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সেই সঙ্গে নগদ- এর নাম ভাঙ্গিয়ে কোনো ধরনের অসৎ উপায় অবলম্বন করলে কঠোর হস্তে দমন করার জন্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেয়া হয়।

বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপিত তথ্যমতে, নগদ-এর গ্রাহক সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি ৬৮ লাখ। উদ্যোক্তার সংখ্যা ২ লাখ ৬৭ হাজার। ডিস্ট্রিবিউটর সংখ্যা ২ শত ৮টি। দৈনিক লেনদেন প্রায় ৯৫৩ কোটি টাকা। প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ৬ হাজার ২৩১ জনের। পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েওেছ ২ লাখ ৫৫ হাজার। দেশব্যাপী উপজেলা পর্যায়ে ৬০২টি নগদ সেবা কেন্দ্র রয়েছে।। দেশব্যাপী ৪৬টি ‘নগদ’ সেবা সেন্টার রয়েছে।

ডাক অধিদফতরের সঙ্গে রেভিনিউ শেয়ারের মাধ্যমে পরিচালিত সরকারি বিভিন্ন নিয়ম মেনে নগদ ডাক বিভাগকে ৫১ শতাংশ রেভিনিউ শেয়ার প্রদান করছে। ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের অ্যাকাউন্টে ১০ হাজার টাকা প্রেরণের মাধ্যমে ‘নগদ’ সেবার উদ্বোধন করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নগদ থেকে ডাক বিভাগ মোট ৪ কোটি ৫৯ লাখ ১০ হাজার ৪৫৫ টাকা রাজস্ব পেয়েছে। ডাক বিভাগ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৭ লাখ ৯৩ হাজার ২৬৬ টাকা, ২০১৯-২০ অর্থবছরে এক কোটি ১৯ লাখ ২২ হাজার ৩১১ টাকা, ২০২০-২১ অর্থ বছরে ৩ কোটি ৩১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৭৮ টাকা রাজস্ব পেয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, নগদ বর্তমানে ১৭ ধরনের সেবা প্রদান করছে। এগুলো হলো, ক্যাশ ইন, ক্যাশ আউট, সেন্ড মানি, মার্চেন্ট পেমেন্ট, ইউটিলিটি বিল পেমেন্ট, জিটুপি, মোবাইল রিচার্জ, করোনা টেস্টের ফি, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফি প্রদান, অ্যাড মানি (ব্যাংক ও কার্ড থেকে), আয়কর প্রদান, ডোনেশন, ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম পেমেন্ট, ইএমআই কালেকশন, ই-কমার্স পেমেন্ট, রেলওয়ে টিকিট ফি পেমেন্ট ও ইন্ডিয়ান ভিসা ফি পেমেন্ট করা হয়।

‘নগদ’ এর উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে রয়েছে, নানাবিধ প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা এবং গ্রাহক ও পরিবেশবান্ধব নানাবিধ কৌশলের কারণে ‘নগদ’ দেশের সাধারণ জনগণের কাছে একটি জনপ্রিয় সেবা হিসেবে নিজেদের অধিষ্ঠিত করা, ২৪ ঘণ্টা গ্রাহকসেবা প্রদানের জন্য রয়েছে হটলাইন নম্বর ১৬১৬৭।

ভাতা বিতরণে সরকারের ব্যয় হ্রাস: সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও পশু সম্পদ মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট, প্রধানমন্ত্রীর করোনাকালীন উপহার, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ভাতা বিতরণ কার্যক্রমে ডাক অধিদফতরের ‘নগদ’ সেবার ব্যবহারে ভাতা বিতরণ খরচ প্রতি হাজারে ২০ টাকার স্থলে ৭ টাকায় নেমে এসেছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন অনুযায়ী, সরকারি সব বিতরণ কার্যক্রম ‘নগদ’ সেবার মাধ্যমে সম্পাদিত হলে শুধুমাত্র বিতরণ ব্যয় থেকে প্রতি বছর একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে।

গ্রাহকের লেনদেন ব্যয় হ্রাস: ‘নগদ’ সর্বনিম্ন ক্যাশ আউট চার্জ, সেন্ড মানি ও বিল পেমেন্ট ফ্রিসহ নানাবিধ সেবার কারণে দেশের প্রান্তিক জনসাধারণ এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার কোটি টাকার সাশ্রয় করতে সক্ষম হয়েছে।

নারীর ক্ষমতায়ন: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন শিক্ষা উপবৃত্তির টাকা এককোটি ৪০ লাখ মায়ের ‘নগদ’ মোবাইল অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। এতে নারীর ক্ষমতায়নে ‘নগদ’ সহযোগী হিসেবে অংশগ্রহণ করতে পেরেছে।

প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি: ‘নগদ’ সেবার প্রবর্তনের পর মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে গ্রাহক, এজেন্টসহ সব ব্যবহারকারী প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে লাভবান হয়েছে।

করোনা মোকাবিলায় ভূমিকা পালন: করোনা টেস্টের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় (স্বাস্থ্যঅধিদফতর) এর একমাত্র পেমেন্ট পার্টনার হিসেবে ‘নগদ’কাজ করেছে।

গ্রাহকের অর্থের সুরক্ষা: ‘নগদ’ এর কার্যকরী ও আধুনিকতর ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ এর মাধ্যমে যেকোনো লেনদেনে ‘অস্বাভাবিকতা’ পরিলক্ষিত হলে, তার ব্যাপারে ‘ফ্ল্যাগ রেইজ’ এর মাধ্যমে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি সুচারুরূপে পালন করা সম্ভব হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি ‘সিরাজগঞ্জ শপ ডট কম’ ও ‘আলাদীনের প্রদীপ’ নামক প্রতিষ্ঠান দুইটির অস্বাভাবিক ‘রিফান্ড রিকোয়েস্ট’ এর বিষয়টিকে সঠিক সময়ে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে, যার মাধ্যমে গ্রাহকের গচ্ছিত অর্থের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সন্দেহজনক লেনদেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বরাবর রিপোর্ট করা সম্ভব হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুনাম অর্জন: ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য দেশের ডাক সেবাগুলো নিজেদের দেশে ‘নগদ’ এর আদলে সেবা প্রদানের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং সে সব ক্ষেত্রে ডাক অধিদফতরের পক্ষ থেকে কারিগরি ও অন্যান্য সহায়তা প্রাপ্তির আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।

সংসদীয় কমিটির সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিকের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটি সদস্য তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, নুরুল আমিন, মনিরা সুলতানা এবং অপরাজিতা হক বৈঠকে অংশ নেন।

স্বাআলো/এসএ