শরিফের ছবি আঁকড়ে স্তব্ধ স্ত্রী, শোকের মাতম জাহাঙ্গীরের বাড়িতে, বাকরুদ্ধ জসিমের বাবা

সিরাজগঞ্জের দরিদ্র তাঁতি পরিবারে বেড়ে ওঠা শরিফ তালুকদারের। সেনাবাহিনীতে তার চাকরি হলে পরিবারের সবাই খুব খুশি হয়েছিলো। শরিফ যখন শান্তিরক্ষা মিশনে মধ্য আফ্রিকায় যান তখন গর্বিত হয়েছিলো পরিবার।

তবে এসব এখন অতীত। গত সোমবার মধ্য আফ্রিকায় বোমা বিস্ফোরণে তিনিসহ ৩ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত হন।

পরিবারের আশার আলো সৈনিক শরিফ তালুকদারের মরদেহের জন্য এখন অপেক্ষা করছে পরিবার। শরিফের ছোটভাই কাউসার তালুকদার বলেন, আমরা এখন ভাইয়ের মরদেহের জন্য অপেক্ষা করছি।

সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার বরখারুয়া গ্রামের লেবু তালুকদারের ছেলে শরিফ। তিন ভাইবোনের মধ্যে শরিফ বড়। ২০১৭ সালে সেনাবাহিনীতে যোগদানের পর সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেন। ছোট দুই ভাইবোনকে লেখাপড়া শেখান।

কাউসার বলেন, ২০২১ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পশ্চিম আফ্রিকা যাওয়ার আগে বিয়ে করেন শরিফ। আশা ছিল মিশন থেকে ফিরে এসে সংসারে সময় দেওয়ার।

তার মৃত্যুর সংবাদ শোনার পর মা তাঞ্জুরা বেগম শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছে বলে জানান কাউসার। কান্না থামাতে পারছেন না বাবা।

শরীফের স্ত্রী ছালমা খাতুন স্বামীর ছবি বুকে আঁকড়ে ধরে স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন।

স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাদের সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছে। তবে কোনভাবেই তাদের থামানো যাচ্ছে না।

বেলকুচি পৌরসভার মেয়র সাজ্জাদুল হক রেজা বলেন, শরিফের মৃত্যুর খবর শোনার পর এলাকার সর্বস্তরের মানুষ তাদের বাড়িতে ছুটে গেছে, শোকার্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে। দরিদ্র পরিবারের আশার আলো শরিফের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না কেউ।

দায়িত্বরত অবস্থায় মারা যাওয়া আরেক সৈনিক জাহাঙ্গীর আলমের মৃত্যুতে তার নীলফামারীর বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার সদর ইউনিয়নের তিতপাড়া গ্রামের লতিফর রহমানের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম (২৬)। তিনি ৫ ভাই-বোনের মধ্যে চতুর্থ।

নিহত জাহাঙ্গীরের বড়ভাই কর্পোরাল আবু জার রহমান জানান, তার ভাই ২০১৫ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১০ মাস আগে তিনি জাতিসংঘের শান্তি মিশনে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের ব্যানব্যাট-৮ এলাকার উইক্যাম্পে যান।

নিহত জাহাঙ্গীরের ছোটভাই বাদশা বলেন, গতকাল দুপুরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তা টেলিফোনে ঘটনাটি জানান। এর পর থেকে পরিবারে শোকের মাতম চলছে। বৃদ্ধ বাবা লতিফর (৬৫) বাকরুদ্ধ। মা গোলেনুর বেগম ( ৫৬) শয্যাশায়ী।

তিনি আরো বলেন, জাহাঙ্গীরের সদ্য বিবাহিত স্ত্রী শিমু আক্তার স্বামীর ছবি বুকে আঁকড়ে ধরে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকছেন। মাঝেমধ্যে চিৎকার করে কেঁদে উঠছেন। সদা বিনয়ী জাহাঙ্গীরের অকাল মৃত্যুতে আশেপাশের গ্রামগুলোতেও শোক বিরাজ করছে।

পরিবারের সদস্যরা সেনাবাহিনী সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন, নিহতের মরদেহ দ্রুত দেশে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।

মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে শান্তিরক্ষী হয়ে গিয়েছিলেন জসিম উদ্দিন (৩১)। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই সদস্য দায়িত্ব পালনের সময় বোমা বিস্ফোরণে তিনিও প্রাণ হারিয়েছেন। মা-হারা জসিমের নিহতের সংবাদে বাকরুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা বাবা আব্দুন নূর। ঘরের মেঝেতে বসে আহাজারি করছেন স্ত্রী শারমিন আক্তার।

জসিমের বড় ভাই সহকারী আনসার বাহিনীর প্লাটুন কমান্ডার জুলহাস উদ্দিনও মাটিতে লুটিয়ে কাঁদছেন। প্রতিবেশী ও নিকট আত্মীয়রা তাদেরকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নের খাটিংগা গ্রামে।

গতকাল মঙ্গলবার রাতে জসিমের বাড়িতে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেছে।

জুলহাস উদ্দিন জানান, মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে সিলেটের ৬১ বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে ফোন করে জসিমের নিহতের সংবাদ জানানো হয়। তিনি ১০ বছর ধরে চাকরি করছিলেন। ৯ মাস আগে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আফ্রিকায় যান। তার ৩ ও ২ বছর বয়সী ২টি ছেলে আছে।

জুলহাস বলেন, আমার ভাইয়ের মরদেহ দ্রুত দেশে আনা হোক। তার পরিবার ও সন্তানদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কিছু করার দাবি জানাই।

বিজয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এইচ ইরফান উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, জসিমের মরদেহ দ্রুত দেশে আনার জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি তার পরিবারের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।

স্বাআলো/এসএ

.