লাখ টাকার চাকরি নয়, দুদকের সেই শরীফের চাওয়া দেশপ্রেমমূলক কাজ

শরীফ উদ্দিন

শরীফ উদ্দিন ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহকারী পরিচালক। তাকে অপসারণ করা হয়েছে চাকরি থেকে। এরপর তিনি একটি দোকানে কাজ শুরু করেছিলেন। এ খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের পর ৩৫টির বেশি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান ভালো বেতনে তাকে চাকরির প্রস্তাব দিয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দুই লাখ টাকার বেশি মাসিক বেতন দেয়ারও প্রস্তাব করেছে।

তবে মোটা বেতনের এসব চাকরিতে শরীফের আগ্রহ নেই। তার আগ্রহ দেশপ্রেম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতির দিকে। চাকরির প্রস্তাব পেয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তবে নিজের অবস্থান থেকে তিনি সরতে নারাজ। সেজন্য এসব প্রস্তাবে তিনি সাড়া দেবেন না।

গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে নিজের এই অবস্থানের কথা জানান শরীফ উদ্দিন।

তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, অনেকেই এগিয়ে এসেছেন। পঁয়ত্রিশটির বেশি প্রতিষ্ঠান থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। সেসবের মধ্যে দেশি এবং আন্তর্জাতিক বড় বড় প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। তারা আমাকে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অনুরোধ করেছেন।

তিনি বলেন, আমি এতদিন দুর্নীতি-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করেছি। দেশপ্রেম এবং প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের ঘোষণা নিয়ে কাজ করেছি। এসব জায়গা থেকে মানুষের জন্য কাজ করা যায়, দেশের মানুষের উপকার করা যায়। আত্মতৃপ্তিও পাওয়া যায়। তাই আমি এমন জায়গায় কাজ করতে চাই, যেখানে থেকে দেশ ও দেশের মানুষের সেবা করা যায়। দুদকে দায়িত্ব পালনকালে লব্ধ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে থেকে কাজ করতে চাই। যেন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করা যায়।

দুদকের সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, আমাকে যারা চাকরির প্রস্তাব দিয়েছেন, তারা হয়তো মানবতা ও সৌজন্যতার কথা ভেবে দিচ্ছেন। এটা মহানুভবতার পরিচয়। তবে আমার কাছে টাকা-পয়সা মূল বিষয় নয়। দুর্নীতি নিয়ে কাজ করে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার, পরিবেশ, হিউম্যান ট্রাফিকিং বা সন্ত্রাসে অর্থায়ন নিয়ে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানে কাজের ‍সুযোগ পেলে আমার ক্ষেত্রটা বেশি উজ্জ্বল হবে বলে মনে করি। এখন কোনো প্রতিষ্ঠান আমাকে পাঁচ-দশ লাখ টাকা বেতনে বড় পোস্ট দিলে হয়তো তাতে ওই প্রতিষ্ঠান ও আমার ব্যক্তিগত লাভ হবে; সামগ্রিকভাবে দেশের তো সেভাবে কোনো লাভ হবে না। আমার স্পিরিট দেশপ্রেম, আমার স্পিরিট প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। আমি ওটাই চাচ্ছি।

নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হলেও প্রভাবশালীদের রোষানল পিছু ছাড়বেনা বলে মনে করেন শরীফ উদ্দিন। তিনি বলেন, এটা তো সত্য যে ওই প্রভাবশালীরাই আমার বিষয়ে কমিশনকে বিভিন্নভাবে মিসগাইড করেছে। কোথাও জয়েন করলে তারা যে সেখানেও আমার পিছু নেবে না তার নিশ্চয়তা নেই। কারণ আমি তো তাদের জন্য থ্রেট।

দেশের মানুষ ও সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সাবেক দুদক কর্মকর্তা বলেন, আমি যখন দোকানে বসি, মানুষ আমাকে মিষ্টি নিয়ে দেখতে আসে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক আসছে। অনেকে তাদের সঞ্চিত অর্থ আমাকে দিতে চাচ্ছে। এটা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। এটাকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটা নবজাগরণ বলে মনে করি। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর অনেকে চাকরি দিতে চাইল। এটা আমার ধৈর্য্যের ফল।

দায়িত্বরত অবস্থায় কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া, সরকারি প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণে দুর্নীতি, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডে দুর্নীতিসহ নানা স্পর্শকাতর বিষয়ে অনুসন্ধান ও মামলা করে আলোচিত হন দুদকের তৎকালীন সহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিন।

চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করে দুদক। এরপর নানা সরকারি-বেসরকারি সংস্থায় চাকরির চেষ্টা করে ব্যর্থ হন তিনি। এক পর্যায়ে জীবিকার তাগিদে বড় ভাইয়ের পরামর্শে তিনি দোকান পরিচালনার দায়িত্ব নেন। চিকিৎসকের পরামর্শও তার এই কাজে যুক্ত হওয়ার একটি কারণ বলে জানান তিনি।

স্বাআলো/এসএ

.

Author
চট্টগ্রাম ব্যুরো