আইএমএফের শর্ত শুভদিক খুলে দিতে পারে, বলছেন অর্থনীতিবিদরা

সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়ার বিপরীতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) যেসব সংস্কার করার কথা বলেছে, সেগুলো সরকার বাস্তবায়ন করলে বাংলাদেশের জন্য খুবই ভালো হবে, শুভদিক খুলে যেতে পারে বলে মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকদের একজন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এবং অর্থনীতির দুই গবেষক আহসান এইচ মনসুর ও মঞ্জুর হোসেন।

তারা বলেছেন, আইএমএফ ঋণ দিতে রাজি হওয়ায় দুই বছরের করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় অর্থনীতিতে যে চাপ দেখা দিয়েছে, তা সামাল দিতে সরকারের জন্য একটি সুন্দর পথ সৃষ্টি হয়েছে। এখন বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকাসহ আরও দাতাসংস্থা বাংলাদেশকে ঋণ দিতে এগিয়ে আসবে। সরকার সাহস পেয়েছে, এখন মনে হচ্ছে সংকটটা আস্তে আস্তে কেটে যাবে। অন্যদিকে এই সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে বাংলাদেশের জন্য একটি সুসংবাদও বয়ে আসতে পারে, শুভদিক খুলে দিতে পারে।

গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক এবং দীর্ঘদিন আইএমএফের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে আসা আহসান এইচ মনসুর বলেন, দুই বছরে করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও বেশ চাপের মধ্যে পড়েছে। প্রধান সূচকগুলো নেতিবাচক দিকে যাচ্ছে। সেপ্টেম্বর থেকে রেমিট্যান্সের পাশাপাশি রফতানি আয় কমছে। যার ফলশ্রুতিতে রিজার্ভ নেমে এসেছে ৩৪ বিলিয়ন ডলারে। এই সংকট কাটাতে আইএমএফ আমাদের ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিচ্ছে। এটা খুবই ভালো খবর। বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ অন্য দাতা সংস্থা ও দেশও এখন বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াবে; ঋণ-সহায়তা দেবে। সরকার এখন সাহস পেয়েছে, কোভিড-১৯-এর মতো যুদ্ধের ধাক্কাও ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে। তবে এই সংকট আমাদের জন্য একটি ভালো সুযোগ এনে দিয়েছে। আমরা যদি আইএমএফের কথামতো তাদের সংস্কার বা শর্তগুলো বাস্তবায়ন করি, তাহলে আমাদের জন্য খুবই ভালো হবে; শুভদিক খুলে যাবে। এত দিন আমরা যেসব অতিপ্রয়োজনীয়, দেশকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে বিষয়গুলো প্রধান অন্তরায় হিসেবে রয়ে গেছে, সেগুলো যদি সরকার আইএমএফের ঋণের শর্তের কারণে বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হয়, তাহলে আমাদের জন্য একটি ভালো কাজ হবে।

আহসান মনসুর বলেন, আইএমএফ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সমস্যা খেলাপি ঋণ কমাতে বলেছে। আমরা স্থানীয় অর্থনীতিবিদরাও দীর্ঘদিন ধরে এ কথা বলে আসছি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছিলো না। বেড়ে চলেছে খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংক গত রবিবার সবশেষ যে তথ্য দিয়েছে, তাতে এখন মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। রাইট অফ (অবলোপন) এবং মামলার কারণে আদালতে আটকে থাকা খেলাপি ঋণ যোগ হলে ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি।

বিশাল অঙ্কের এই খেলাপি ঋণ নিয়ে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে না, দেশে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয় উদ্বেগ প্রকাশ করে ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসান মনসুর বলেন, আইএমএফের কথামতো বলি, আর শর্ত বলি-সে কারণেই হোক না কেন খেলাপি ঋণটা যদি আমরা কমাতে পারি, সরকার যদি এটা কমাতে কঠোর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে আমাদের জন্য, দেশের জন্য দেশের ব্যাংকের জন্য খুবই ভালো হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত সাড়ে ৮ শতাংশ থেকে কমপক্ষে ১২-১৩ শতাংশে নিয়ে যেতে রাজস্ব খাতের ব্যাপক সংস্কার করতে বলেছে আইএমএফ। আমরা যদি এ ব্যাপারেও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিই; তাহলেও বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল হবে। এ ছাড়া আইএমএফ বাংলাদেশ ব্যাংককে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে বলে, সরকার যদি এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়, সেটাও আমাদের জন্য ভালো হবে। এ ছাড়া আইএমএফ অন্য যেসব সংস্কার করতে বলেছে, সেগুলোও আমাদের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভের হিসাব পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মানের করা, বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়সহ নানা পরামর্শ দিয়ে আসছে সংস্থাটি। আইএমএফের ওপর কোনো কারণে নির্ভরশীল না থাকায় এত দিন সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এসব পরামর্শ আমলে নেয়নি। করোনা মহামারির দীর্ঘ ধাক্কার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও বেশ চাপে পড়েছে। আর চাপ সামলাতে সরকার আইএমএফের ঋণ নিচ্ছে। এই ঋণের বিনিময়ে আইএমএফ এই সব শর্ত আবার দিয়েছে। সরকার এগুলো বাস্তবায়ন করলে খুবই ভালো হবে। তাই আমি বলছি, এই সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে বাংলাদেশের জন্য একটি সুসংবাদও বয়ে আনতে পারে; শুভদিক খুলে দিতে পারে।

একই কথা বলেছেন অর্থনীতির আরেক গবেষক বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক মঞ্জুর হোসেন।

তিনি বলেন, আইএমএফের ঋণটা খুবই জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছিলো। সেটা আমরা পেয়েছি। সরকার সাহস পেয়েছে। সংকটটা কেটে যাবে মনে হচ্ছে। তবে, ঋণের বিষয়ে আইএমএফ যেসব শর্তের কথা বলেছে, সেগুলোর একটাও কিন্তু নতুন নয়। সবগুলোই পুরনো এবং প্রত্যেকটিই গুরুত্বপূর্ণ ও আমাদের জন্য মঙ্গল। এগুলো যদি আমরা বাস্তবায়ন করি তাহলে আমাদের জন্য সত্যিই ভালো হবে।

সরকারের নীতিনির্ধারকদের একজন পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ভবিষ্যৎ ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আমরা আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছি। আমাদের নিজেদেরও কিছু সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নাধীন আছে। যেমন- আমরা খুব করে চাই, আমাদের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কমুক। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকও তাই চাচ্ছে, সেটা মিলে গিয়ে আমরা যদি খেলাপি ঋণটা সত্যিই কমাতে পারি, তাহলে দেশের জন্য দেশের অর্থনীতির জন্য খুবই ভালো হবে।

মন্ত্রী বলেন, সদস্য দেশ হিসেবে তারা কিছু পরামর্শ দিচ্ছে, যেগুলো আগেও দিয়েছে। আমরা আমাদের দেশের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবো।

স্বাআলো/এসএ

.

Author
ঢাকা অফিস