চেয়ারম্যান রাজুর হস্তক্ষেপে রূপদিয়ার নীলকুঠি ও বধ্যভূমির সংস্কার শুরু

যশোর সদর উপজেলার রূপদিয়া বাজারের পার্শ্ববর্তী ভৈরব নদীর তীরে এশিয়া মহাদেশের প্রথম সর্ববৃহৎ ইংরেজ শাসনামলের নীলকুঠি ও একাত্তরের বধ্যভূমিটি বর্তমানে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়ায় গতকাল রবিবার সংস্কারের উদ্যোগ নেন নরেন্দ্রপুর ইউপি চেয়ারম্যান রাজু আহম্মেদ।

যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে এই কালের স্বাক্ষীটি ইতিহাসের পাতা থেকে চিরোতরে মুছে যেতে দেখে তিনি পুনরায় সংস্কারের উদ্যোগ নেয়ার পরদিনই কাজ আরম্ভ হলো আজ।

রবিবার (২৭ নভেম্বর) বিকালে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি রক্ষা করার জন্য সংস্কার ও শহীদদের স্মরণে স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন ইউপি চেয়ারম্যান রাজু আহম্মেদ।

তিনি বলেন, অযত্নে অবহেলিত নীলকুঠীর শেষ স্মৃতি রক্ষা ও অবৈধ দখলদারত্বের হাত থেকে মুক্ত করে সংস্কার করার জন্য আমি সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করবো এবং এখানে সকল শহীদদের স্মরণে স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করতে চাই। এজন্য মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের জনগণ ও নরেন্দ্রপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগসহ সকল অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দকে আমার পাশে থাকার জন্য অনুরোধ করেছি।

জানা যায়, ইংরেজ শাসকরা রূপদিয়ার আন্ধারী বটতলার ভৈরব নদীর মোহনায় এশিয়া মহাদেশের প্রথম নীলকুঠি সর্ববৃহৎ কুঠি স্থাপন করে যশোর অঞ্চলের সাধারণ মানুষদের জোরপূর্বক নীল চাষে বাধ্য করাতেন। কোনো মানুষ যদি নীলচাষ করতে অস্বীকার করত তা হলে এই কুঠিতে ধরে এনে নির্মম নির্যাতন চালাতেন ইংরেজ শাসকরা। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের মাত্রা এতোই বেশী ভয়াবহ হতো যার ফলে ঘটনাস্থলেই বহু মানুষের মৃত্যু হয়ে যেত।

এছাড়াও নানান ভাবে চলত ইংরেজদের অত্যাচার-নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড। এ কারনেই; রূপদিয়ার এই নীলকুঠিকে অভিশপ্ত নীলকুঠি বলে চিহ্নিত হয়েছিলো। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময় ইংরেজ শাসকদের রেখে যাওয়া অভিশপ্ত নীলকুঠিটি বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহার করে এদেশের স্বাধীনতা বিরোধীরা। রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও দোসর পাকিস্তানী খান সেনারা এদেশের মুক্তিকামী মানুষদের ধরে এনে নির্যাতনের পর হত্যা করে নীলকুঠিতে পুঁতে রাখতো আবার কাউকে নদীতে ভাঁসিয়ে দিতো। রূপদিয়া এলাকার কিছু বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্বপক্ষের মানুষ এই কুঠিতে দোসর বাহিনীর দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবর আলী দফাদার, মকবুল হোসেন ও আব্দুল ওহাব মিন্টু বলেন, অভিশপ্ত নীলকুঠি ও ৭১ এর বধ্যভূমিতে নিয়ে দোসর বাহিনীর চালানো ভয়ংকর নির্যাতনের কাহিনী। নানা ইতিহাসের কালের সাক্ষীটি সিংহভাগই আজ দখলদারিত্বের কবলে। স্মৃতি বলতে পড়ে আছে শুধু শ্যাওলাধরা ইটের অবশিষ্ট ধ্বংসস্তুপ। নীলকুঠিটি হচ্ছে একাত্তরের অন্যতম বধ্যভূমি। রাজাকারেরা বিভিন্ন স্থান থেকে বাঙালি সন্তানদের ধরে এনে নির্যাতনের পর, হত্যা করে এখানে ফেলে রেখে দিতো।

জানা গেছে- মুক্তিযোদ্ধা মাফুজুল হক, আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম মোস্তফা, চাউলিয়া গ্রামের স্বর্ণকার গফুর মৃধা, কচুয়ার শানাল, বনগাঁর গহন আলী, গমতিতলার জলিল মোড়ল ছাড়া নাম না জানা বহু লোককে এই নীলকুঠিতে হত্যা করেছে পাকিস্তানী দোসর বাহিনী।

নরেন্দ্রপুরের আফসার জল্লাদ, কচুয়ার খালেক মড়ল (লিডার), শাখাঁরীগাতীর কমান্ডার গোলাম, চাউলিয়ার মোহাজের, লুৎফার মৌলভী, ওয়াজেদ আলী, কচুয়ার খালেক এরা সবায় রাজাকার ছিলো। উল্লেখিত রাজাকাররা অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে এই স্থানে মাটি চাপা দিয়েছে আবার অনেকেই নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে।

ঐতিহাসিক স্থানটির কাজ পরিদর্শনের সময়ে উপস্থিত ছিলেন নরেন্দ্রপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউপি সদস্য ফসিয়ার রহমান, আঃ মালেক, যুবলীগ নেতা ও ইউপি সদস্য আঃ রাজ্জাক, ইউপি সদস্য মকবুল হোসেন, মনিরুজ্জামান শাকির,

যশোর সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সদস্য ইমরান আলী, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পরিচালক, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ইয়াসিন আলী সোহাগ, ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি শাহীন আলম ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম কিরন, ছাত্রলীগ নেতা টুটুল, আলামিনসহ বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ।

স্বাআলো/এসএস

.

Author
নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর