ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের খোঁজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে

দেশের বৃহৎ ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৩০তম কেন্দ্রীয় সম্মেলন ৬ ডিসেম্বর। এদিন রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এ সম্মেলন হবে। তবে এর আগেই সংগঠনের শীর্ষ দুই পদ পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন পদপ্রত্যাশীরা। এতে থেমে নেই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), মেডিকেল, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের নেতারাও। এবারের নেতৃত্ব নির্বাচনে ঢাবির বাইরের মেধাবী ছাত্রনেতা ও নারী নেতৃত্ব প্রাধান্য পেতে পারে-এমন আভাস পাওয়া গেছে হাইকমান্ডের সঙ্গে আলাপে।

সংগঠন সূত্রে জানা যায়, ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই পদে বরাবরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীরা প্রাধান্য পায়। টানা দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে এ সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব আসছে ঢাবি থেকে। নেতৃত্বের এমন স্বরূপ এক ধরনের প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগে ঢাবির বাইরে থেকে শীর্ষ দুই পদে নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়েছিলেন। তারা সংগঠন পরিচালনায় বেশ আলোচিত ছিলেন। তবে, এ ধারা এবার পরিবর্তন হতে পারে এমন আভাস পাওয়া গেছে।

ছাত্রলীগের ইতিহাসে বেশ আলোচিত লিয়াকত শিকদার-নজরুল ইসলাম বাবু কমিটি। তারা দুজনই ঢাবির বাইরে থেকে নেতৃত্বে এসেছেন। ওই কমিটির সভাপতি লিয়াকত শিকদার ঢাকা কলেজের এবং নজরুল ইসলাম বাবু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এ কে এম এনামুল হক শামীম ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি হয়েছিলেন। লিয়াকত-বাবু ২০০৬ সালে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব ছাড়ার পর আরো কেউ ঢাবির বাইরে থেকে সংগঠনের শীর্ষ দুই পদে আসেনি।

নেতাকর্মীদের অভিযোগ, প্রতিবারেই ঢাবি ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের অনেক পদপ্রত্যাশী থাকেন। তারা বিভিন্ন সময় দলের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষাও রয়েছে তাদের। তবে এসব নেতারা ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই পদে আসীন হতে পারেন না ঢাবি শিক্ষার্থী না হওয়ার কারণে। এ নিয়ে ক্ষোভ ঝেড়েছেন ঢাবির বাইরে থাকা পদপ্রত্যাশীরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেখে নয়; বরং যোগ্যতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলি দেখে নেতা নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে তারা।

অবশ্য আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন ভিন্ন কথা। তারা জানান, ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই পদে নেতা নির্বাচনে কোন প্রতিষ্ঠানকে প্রাধান্য দেয়া হয় না। যারা যোগ্য, মেধাবী, ক্লিন ইমেজের তাদের হাতেই নেতৃত্ব দেয়া হয়।

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের উপ-প্রচার সম্পাদক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক নেতা আল আমিন শেখ বলেন, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব রয়েছে, যারা ছাত্র সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। অতীতে অনেকে ঢাবির বাইরে থেকে ছাত্রলীগকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারা বর্তমানে জাতীয় রাজনীতিতেও সমাদৃত।

নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রতিষ্ঠান নয় বরং যোগ্য ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেয়া হয় মন্তব্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান, অবস্থান, মর্যাদা, শিক্ষার মান, এগুলো বিবেচনা করে ঢাবিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ছাত্রলীগের রাজনীতিতে শীর্ষ পদে কে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তা কখনো গুরুত্ব পায় না। ব্যক্তির যোগ্যতা, দক্ষতা, বিশ্বাস, অতীতের নেতৃত্ব, সে কতটুকু সৎ, দলের প্রতি নিবেদিত কতটা; এগুলো বিবেচনা করে নেতা নির্বাচিত হয়।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান বলেন, ছাত্র সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য, ছাত্রত্ব আছে, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত নয়, আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আনুগত্যে পরীক্ষিত, এ ধরনের নেতাকর্মীরাই এবার কমিটিতে স্থান পাবে।

এবারের সম্মেলনে ঢাবির বাইরে থেকে কয়েক ডজন যোগ্য নেতাকর্মী রয়েছে। তাদের মধ্যে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এবং বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি খন্দকার জামিউস সানী, কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-প্রচার সম্পাদক আল-আমিন শেখ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জোবায়ের আহমেদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহসভাপতি ও কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদক হামজা রহমান অন্তর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকিউল ইসলাম ফুয়াদ।

ছাত্রলীগের ইতিহাসে বুয়েট থেকে কখনো শীর্ষ নেতৃত্ব আসেনি। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকলেও একমাত্র ব্যতিক্রম বুয়েট। তবে এবার বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি খন্দকার জামিউস সানী কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ নেতৃত্বে জোর আলোচনায়। সানী বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি হওয়ার আগে ছিলেন বুয়েটের আহসানউল্লাহ হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি। বর্তমানে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে বিরোধী দলের আন্দোলন, ছাত্রদলের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবস্থান ঠেকানোসহ নানা ইস্যুতে দলের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে জোর আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক জোবায়ের আহমেদও।

এবারের সম্মেলনে নারী নেতৃত্বের বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে আওয়ামী লীগ। ছাত্রলীগের ৭৪ বছরের ইতিহাসে সংগঠনের শীর্ষ দুই পদ বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে কোনো নারী নেতৃত্ব দেখা যায়নি। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলেন মারুফা আক্তার পপি। তিনি দায়িত্বের সঙ্গে সংগঠন পরিচালনা করলে তাকে সভাপতি পদে নির্বাচিত করার দাবিও ওঠে। কিন্তু নানা কারণে শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। সর্বশেষ কয়েকটি সম্মেলনে নারী নেতৃত্বের বিষয়টি বেশ আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা আসেনি। তবে, এবার নারী নেতৃত্বের বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা।

আসন্ন সম্মেলনে নারীদের মধ্যে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন ছাত্রলীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ও কবি সুফিয়া কামাল হলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তিলোত্তমা সিকদার, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক রনক জাহান রাইন, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি সভাপতি ফরিদা পারভীন। এবিষয়ে আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, নারীদের মধ্যে যদি যোগ্যতা থাকে তাহলে অবশ্যই নেতৃত্বে আসতে পারে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্য নারী নেত্রী রয়েছে।

উত্তর-দক্ষিণ ছাত্রলীগের নেতৃত্বের দৌড়ে যারা: ২ ডিসেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রলীগের যৌথ সম্মেলন। এর আগেই মহানগরের দায়িত্ব পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন পদপ্রত্যাশীরা। উত্তরে আলোচনায় রয়েছেন সংগঠনটির উত্তরের উপ-কর্মসূচি ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক রিজভী আহমেদ বুলবুল, সহসভাপতি সোহেল মিয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক তরিকুল ইসলাম রাহুল, রায়হান পারভেজ, যুগ্ম সম্পাদক কাজী মিজানুর রহমান। দক্ষিণ ছাত্রলীগের সহসভাপতি ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ, দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক আল আমিন সুজন, সহসভাপতি সাব্বির আহমেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক ইব্রাহিম নাঈম প্রমুখ। এছাড়াও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও এমএইচ শমরিতা মেডিকেল কলেজের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদুল আলম আরাফাত নেতৃত্বের দৌড়ে রয়েছেন।

স্বাআলো/এসএ

.

Author
ঢাকা অফিস