ইটভাটার আগুনে পোড়ানো হচ্ছে কৃষকের প্রাণ, জমি হারাচ্ছে উর্বর শক্তি!

মাটির ওপরের নরম অংশটিকে বলা হয় (টপ-সয়েল) উর্বরা শক্তিই ফসলি জমির প্রাণ। জমির প্রাণ খ্যাত এ অংশ কেটে নিয়ে পোড়ানো হচ্ছে ইটভাটায়। যা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেও রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।

জানা গেছে, মাটির উপরিভাগ টপ সয়েলেই থাকে জমির উর্বরা শক্তি। যে জমির উর্বরা শক্তি বেশি, তার উৎপাদন ক্ষমতাও তত বেশি। চাষাবাদের সময় জমিতে প্রয়োগ করা জৈব ও রাসায়নিক সারের একটা বড় অংশ ফসল উঠলেও জমিতে থেকে যায়। যা পরবর্তী ফসল বোনার সময় বেশ কাজে লাগে। ফসলি জমির ওপরের অংশ কেটে নিলে ওই জমি শক্তিহীন হয়ে প্রাণহীন হয়ে পড়ে। ফলে পরবর্তী কয়েক বছর ওই জমির উৎপাদন ক্ষমতা অনেকটা কমে যায়, এবং উচ্চমূল্যে চাষাবাদ করেও আশানুরূপ ফসল না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা।

শুকনো মৌসুমে এসব জমির ওপরের অংশের দুই/তিন ফুট পর্যন্ত মাটি প্রায় প্রতিনিয়তই কেটে নেয়া হচ্ছে। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এসব জমির মাটি খুঁড়ে তুলে নিয়ে ইটভাটায় বিক্রি করছেন। এ ক্ষেত্রে জমির মালিককে জৈব সার কেনা বাবদ সামান্য কিছু অর্থ সহায়তা দিচ্ছে। এসব ব্যবসায়ী উঁচু জমি টার্গেট করে কৃষকদের ভুলভাল বুঝিয়ে রাজি করাচ্ছেন। তারা কৃষকদের বলছেন, উঁচু জমিতে পানি বেশি লাগে, তাই জমি নিচু করা দরকার। এসব ভুল তথ্য দিয়ে জমি খুঁড়তে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। মাটি ব্যবসায়ীরা এ বছর যে জমির মাটি তুলে নিয়ে গভীর করছেন, পরের বছর তার পাশের জমির মালিকদেরও লোভ দেখাচ্ছেন। কারণ সর্বদাই নিচু জমিতে নেমে যায় পানি ও পলি। এ ফাঁদে পা দিতে বাধ্য হচ্ছেন পার্শ্ববর্তী জমির মালিকরাও। এভাবেই ফসলি জমির প্রাণ কেটে নিয়ে প্রতিনিয়ত ইটভাটায় পোড়ানো হচ্ছে।

কৃষকরা তাদের চটকদার কথায় রাজি হয়ে জমি খুঁড়ে মাটি দিচ্ছেন ইটভাটায়। ভাটার মালিকরা এসব মাটি নিয়ে তৈরি করছেন ইট। ভাটার মালিকরা এভাবে লাভবান হলেও অল্প কিছু নগদ টাকার লোভে জমির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষিরা। উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

প্রায়ই এসব বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা আদায় করছে জেলা প্রশাসন। কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছে না। জরিমানা গুণেও তারা চালিয়ে যাচ্ছেন এ ব্যবসা। ফলে জেলার উঁচু জমিগুলো প্রতিনিয়ত নিচু হয়ে যাচ্ছে। জেলার সব ইটভাটায় এসব ফসলি জমির উর্বরা অংশ দেখা যায়। তবে এসব মাটি কারো কাছ থেকে জোর করে নেয়া হয় না বলে জানান ভাটার মালিকরা। তারা বলছেন, জমির মালিকরাই টাকার বিনিময়ে মাটি বিক্রি করছেন। ইট তৈরির জন্য কাঁচামাল হিসেবে এসব মাটি কিনে নেন তারা।

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ হামিদুর রহমান বলেন, জমির ওপরের ছয় থেকে আট ইঞ্চি গভীর পর্যন্ত মাটির উর্বরা শক্তি থাকে। কোনো কারণে এ অংশ উঠে গেলে ওই জমির উর্বরা শক্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং উৎপাদনও ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। টপ সয়েল তুলে ফেললে জমি পুনরায় স্বাভাবিক হতে অন্তত পাঁচ/সাত বছর চাষাবাদ করতে হয়। এ দীর্ঘ সময়ে উৎপাদন কমে গিয়ে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ কারণে ফসলি জমির মাটি না তুলতে প্রতিনিয়ত কৃষকদের নিয়ে সচেতনতা মূলক সভা-সমাবেশ করা হচ্ছে।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ উল্ল্যাহ এ বিষয়ে বলেন, কৃষকদের ফসলি জমির মাটি বিক্রি করতে নিষেধ করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে মাটি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে, করা হচ্ছে জরিমানাও। তারপরও অনেক কৃষক অবাধে কিছু টাকার লোভে জমির উর্বর শক্তিকে নষ্ট করছে। কৃষকদের মাঝে সঠিক ভাবে সচেতনতামূলক সভা সমাবেশ করে এটা রোধ করতে হবে এবং সেই সাথে অনুমোদনবিহীন ইট ভাটা বন্ধ করে দেয়া হবে।

স্বাআলো/এসএস

.

Author
জেলা প্রতিনিধি, লালমনিরহাট